আহা ইসলাম ! আহা মুসলিম !

0 ৪৩

বেশ্যার কাছে গেলাম দাওয়াত নিয়ে, এই তুমি যা করছ তা পাপ। আল্লাহর গজব আসবে এতে! ছেড়ে দাও পাপের পথ। বেশ কতক্ষণ ধর্ম কপচালাম। বেশ্যা আমার নিতম্বে লাথি ছুঁড়ে বলল, যাহ ভাগ! তোর আল্লা নিয়া তুই মর! আমি আমার কাজ করি।তুই তোর কাজ কর! তোর আমি ক্ষতি করি?
আমি সহিষ্ণু ধার্মিক। তাই লাথি খেয়ে ফিরে এলাম।


গেলাম পুলিশের কাছে। রাস্তার পাশেই এক
নিরীহ রিকশাওয়ালা থেকে ঘুস খাচ্ছিল সে। আমি কাছে গিয়ে সসম্মানে শুনিয়ে দিলাম আমার ধর্মের কথা। ঘুস খাওয়া হারাম, পাপ। পুলিশ খানিক আগে বেশ্যার লাথি খাওয়া ব্যথিত পাছায় তার শক্ত ডাণ্ডার বাড়ি দিয়ে ভাগিয়ে দিলো।
আমি মলিন মুখে আমার ধর্ম নিয়ে ফিরে এলাম।


গেলাম রাষ্ট্রের কাছে। আমি বিচার চাই। ঘুস খাওয়া পুলিশ আর বেশ্যাবৃত্তি করে বেড়ানো মহিলার বিচার। রাষ্ট্র তার কাছে পৌঁছতে গড়ে রেখেছে অসংখ্য দেয়াল। সেইসব দেয়ালে দেয়ালে নিয়োজিত অজস্র প্রহরী। আমি সেইসব প্রহরীদের ধর্ম শুনিয়ে অতঃপর নিরাশ হয়ে ঘুস প্রদান পূর্বক পৌঁছলাম রাষ্ট্রের অন্দরমহলে। রাষ্ট্র তখন নগ্ন নারীর সাথে উল্লাসে মগ্ন।
আমাকে দেখেই রাষ্ট্র রুষে উঠল। হুংকার ছেড়ে বলল, এখানে কী?
আমি বিনীত গলায় আরজ করলাম, বিচার চাইতে এসেছি।
রাষ্ট্র ভ্রু কুঁচকে বলল, কিসের বিচার?
আমি বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। আগে রাষ্ট্রের আত্মশুদ্ধি দরকার। আমি হিকমার সাথে রাষ্ট্রকে ধর্মের বাণী শোনাতে লাগলাম। কত বিনয় নিয়ে!
রাষ্ট্র আমার নামে মামলা ঠুকলো। আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিলো পুলিশকে। আমি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এলাম জনসাধারণের মাঝে, বস্তির লোকারণ্যে। আমি ওদের মতই সাধারণ একজন। ভাবলাম, এরা অন্তত আমার কথা শুনবে। আমি বস্তির ঘরে ঘরে যাই। সালাত ও সাওমের কথা বলি। পাপ ও পুণ্যের বিশ্লেষণ করি।


গিয়ে দেখি, ওদের সামনে টিভি। টিভিতে অশ্লীলতা। অশ্লীল অভিনেতা, অভিনেত্রীরা তারকা। ওরাও সবাই তারকা হতে চায়। ওরা সবাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত পদ পেতে চায়। রাষ্ট্রের বড় পদগগুলোতে বসে আছ একেকটা তাগুত। ওরা তাগুত হতে চায়। এটা ওদের স্বপ্ন।
ওদের চোখে এমনি রঙ বেরঙের স্বপ্ন। রাষ্ট্রীয় বড় পদের স্বপ্ন। নেতা হবার স্বপ্ন। তারকা হবার স্বপ্ন। আমার কথা শোনবার মত মানুষ নেই। ওরা আমার দিকে পিটপিট করে তাকায়। ধর্মের দিকে কটাক্ষ দৃষ্টি ছোঁড়ে। আমার মুখে গজানো দাড়ির দিকে ঘৃণার চোখে তাকায়, ভয়ালু দৃষ্টিতে তাকায়।
ওরা এমন শুভ্র পোশাকধারী, দাড়িওয়ালা প্রাণীদের সিনেমার নায়ক নয়, ভিলেনরূপে দেখতে অভ্যস্ত। ওরা এই সাদাসিধে প্রাণীগুলোকে নাটকে, সিনেমায়, একাধিক সুন্দরী সাথে নিয়ে দেখেনি কখনো। ওরা এদের কখনো দেখেনি সংসদে। দেখেনি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায়। ওখানে দেখে একটা নগ্ন নারী, তারকা কিংবা রাষ্ট্রীয় ঘুসখোর নেতা। তাই ওরা আমার কথা, আমার ধর্ম শোনেনি। ওরা হতে চায় রঙিন মানুষ। সফল মানুষ। আমার মতন দাড়িওয়ালা, সাদা পোশাকধারী প্রাণীগুলোকে ব্যর্থ, পরাজিত, নগণ্য, ধিকৃত অবস্থায় দেখে। যাদের কাজ পৃথিবীর মোহ ভুলিয়ে পরকালের দিকে ধাবিত করা। কিন্তু ওরা সফল হতে চায়। জয়ী হতে চায়। তাই ওরা আমার কথা শোনে না। আমি নগণ্য। আমি পরাজিত।
আমি বুকে ব্যথা নিয়ে, একা একা কিংবা মুষ্টিমেয় কিছু অসহায় মানুষ নিয়ে নামাজে যাই। কুরান পড়ি-
“আসমান যমীনের রাজত্ব তারই।”
“নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অহমিকা তাকেই সাজে।”
এ সমস্ত আয়াতে চোখ বুলালে জল ছলছলে হয়ে ওঠে আমার অসহায় চোখ। আমি আকাশের দিকে তাকাই। দিনের আকাশ। রাতের আকাশ। চন্দ্র, সূর্য, রাতের তারা, মহাবিশ্ব। সেখানে রাজত্ব চলছে তারই। আমি দৃষ্টি রাখি পৃথিবী নামক ছোট্ট এই গ্রহে, সেই পৃথিবীর দেশে দেশে, সেখানে রাজত্ব চলছে আল্লাহর অবাধ্য দাসদের। স্বরচিত আইনে, বিধানে শাসন করছে রাষ্ট্র।


আমি আবার চোখ রাখি কুরানে-
“আর যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী শাসন করে না তারাই হলো কাফের।”
আমি বড্ড অসহায়! কুরানের এই কথাগুলোসহ অজস্র আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে পারি না। ব্যাখ্যা দিলেই আমাকে উগ্র বলা হবে। জীবন বিষিয়ে তোলা হবে আমার। কারাগারের অন্ধকারে পুরে দেওয়া হবে। আমার আওয়াজকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। গলায় ফাঁসও দেওয়া হতে পারে। ওরা পরাক্রমশালী, ওরা মহা ক্ষমতাশীল। যদিও এদের আমি এক ফোঁটা ভয় পাই না। আমি পরাক্রমশালী বলে মানি একমাত্র আল্লাহকে। তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ ক’জনের ভাগ্যে থাকে!
কিন্তু আমার মৃত্যুদণ্ডের পর কী হবে? আমার আপন মানুষগুলো আমার ব্যাপারে আক্ষেপ করে বলবে, ছেলেটা তো ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেছিল। মেধাবীও ছিল। তারপরও জঙ্গি হলো কিভাবে? আহ! আজকাল ভালো ও উচ্চ শিক্ষিত ছেলেগুলোও জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে!
আমার আপন লোকেরা আমায় ঘৃণা করবে। কিছু কিছু ইসলামী বক্তারাও মাহফিল গরম করবে আমার বিরুদ্ধে কথা বলে। তারা জোর গলায় বলবে, ইসলামে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। সুন্দর ধর্ম। তখন আমার অবর্তমানে ওদের কথায় উপহাস করে কেউ বলবে না, হ্যা, শান্তিরই তো ধর্ম! বড় শান্তিপূর্ণভাবে সুদ, ঘুস, ধর্ষণ, ব্যভিচার চলছে। বড় সুন্দরভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে। কেউ কাউকে বাধা দিচ্ছে না। বাধা দিতে গেলেই উগ্রতা হবে, হাঙ্গামা হবে৷ অশান্তি হবে।
এরচে বরং বছরের পর বছর মানুষকে নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব জাকাতের তা’লিম দিতে হবে। ওয়াজ শোনাতে হবে। কিছু মানুষ বয়ান শুনলে, বক্তারা সেলিব্রেটি হলে, পেট চললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ ইসলাম!
তাই আমি এভাবে মরতে চাই না। কিন্তু আমি বেঁচে থেকেও রোজ মরে যাই। যখন দেখি মানুষগুলো নাটক, সিনেমা, গেমস নিয়ে মত্ত আর ওদিকে মুসলিমদের রক্ত নিয়ে হলি খেলছে বিশ্ব। এদিকে ইসলামি মাহফিলগুলোতেও চলছে নাটক, ড্রামা, অভিনয়। তাদের বক্তব্যের ভিডিও নিয়ে তরুণ শ্রেণি বানাচ্ছে ফানি ভিডিও। চলছে রমরমে ব্যবসা। সর্বত্রই চলছে অভিনয়। অভিনয় বাণিজ্য।
আহা ইসলাম! আহা মুসলিম!

Hits: 9

Comments
Loading...