Hits: 8

তুমি নারী তুমি মহীয়সী

0

মহাখালী বাসস্টপ থেকে বাসে উঠলো নিশাত ।
একটা চাকুরির ইন্টারভিউ ছিল, ইন্টারভিউ শেষ করেই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
সেই সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, আর ইন্টারভিউ না জবানবন্দি ,কি সব প্রশ্ন যে করলো।
প্রথমে নাম দেখে আরে আপনারতো এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদারের নামের সাথে মিল আছে ।
স্কুল- কলেজের পড়াশোনা দেখি মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড, আবার ঢাকা ভার্সিটিতে অর্নাস- মাস্টার্স, আবার খুব ভালো রেজাল্টও দেখছি, ভালো ,খুব ভালো।
-তা সব সময়ই হিজাব মেন্টেইন করেন নাকি?

  • বললো, জী।
  • এখানে ও করবেন?
  • মাফ করবেন, আপনাদের নীতিমালায় ড্রেস কোডের ব্যাপারে কিছু বলা নাই।
  • তা অবশ্য ঠিক, আচ্ছা আপনি চাইলে হিজাব মেন্টেইন করতে পারেন।
  • আচ্ছা, আপনি এত ভালো রেজাল্ট দিয়ে আর ভালো চাকুরি পেতে পারেন, তা আমাদের এখানে ইচ্ছুক কেন?
  • নিশাত সুন্দর করে তার ব্যাখ্যা দিলো।
    সবাই থ হয়ে ওর কথা গুলো শুনলো ।ওর কথা শেষ হলে একজন বলল,
  • বাহ্, দারুণ ব্যাখ্যা দিলেন। আপনি দেখছি অনেক কিছুই জানেন ।
    সাইডে বসা এক ইয়াং স্যার বলল, আপনার চোখ গুলোতে সরলতা আর মোহনীয়তা আছে, চোখের সামনে দারোয়ান হিসেবে চশমা ঝুলিয়ে রেখেছেন, চশমাতে পাওয়ার আছে নাকি?
  • জী, আছে ।
    আরেক স্যার ,এ স্যার কে উদ্দেশ্য করে বলল, সুমন স্যার আপনি শুধু ওনার চোখের মোহনীয়তা দেখলেন, ওনি কিন্তু স্পষ্টভাষী, সাহসী ও বটে।
    আমাদের সব প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট আর সঠিকভাবে দিয়েছেন।
  • কেরি অন, আপনি পারবেন নিশাত পারভীন ।
    আর ও কি সব হাবিজাবি প্রশ্ন ।
    শেষে ঠিকঠাক মতো সব কাগজপত্র জমা দিয়েছে কিনা জেনে বিদায় দিলো।
    বাসের জানালা খোলা থাকাতে কিছু ধুলো হাওয়া এসে ভিতরে ঢুকে গেল ।চশমা না থাকলে সব ধুলো
    ওর চোখে ঢুকে যেত ,সত্যিই চশমা চোখের দারোয়ানের মত কাজ করে।
    চশমা মুছার জন্য ব্যাগের ভিতর থেকে এক ছড়া রিং বের করলো , গত বছর মেজ মামা এটা ওকে গিফট করেছে। এক ছড়াতে অনেক কিছু অ্যাড করা।দেখতে চাবির রিং এর মতো ,তাতে একটা নেলকাটার, একটা চিরুনি, একটা খাপের মতো তাতে ক্লিক করলে একটুকরো কাপড় বেরিয়ে আসে, তা দিয়ে চশমা মুছা যায়, একটা চাকু,একটা কলম, একটা চাবির রিং । মামা ওর হাতে এটা দিয়ে বলেছিল , তুমি অপরূপা, কোমলময়ী, সাহসী, প্রতিবাদী, আর সব কিছু তোমাকেই ধরে রাখতে হবে ।
    ওর যখন যেটা দরকার তা দিয়ে কাজ করে ।
    চশমা টা মুছে আবার তা পরল।
    বাসটা একটা স্টপিজ মাত্র পার হয়েছে ।
    হঠাৎ ও খেয়াল করলো ,ওর বা পাশে কারোর হাতের স্পর্শ লাগলো ।
    ভুল মনে হয়, বা পাশে তো জানালা, ডান পাশে এক মহিলা বসা,ও একটু সরে বসালো ।
  • না, ভুল না ।ওর সিট আর বাসের দেয়ালের একটু ফাঁক দিয়ে কেউ হাত ঢুকিয়েছে।
    কিন্তু কেন?
  • এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ওর হাত পা ঠান্ডা হওয়ার উপক্রম ।
    বাড়ি থেকে আসার সময় ও বারবার করে বাবা বলে দিয়েছে, সাবধানে থাকবি । যা দিনকাল পরেছে, চারদিকে মানুষরুপী শয়তান ।

মাথা গরম করলে চলবে না, ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে,
ও সাহসী, ভয় পেলে হবে না।
চিৎকার করবে , এতে শয়তান টা হাত সরিয়ে ফেলবে আর ওর কথা ও কেউ বিশ্বাস করবে না।
কি করবে , ভেবে চাকুর কথা মনে পড়ল, চাকু দেখিয়ে মামা বলেছিল তুমি সাহসী ।
চাকু বের করে হাতে নিলো।
ও সরে বসাতে হাতটা আগের চেয়ে আর বেশি ঢুকিয়ে দিয়েছে ।
এটাই সুযোগ, যেই ভাবা ,সেই কাজ ।
দিলো চাকু টা হাতের মধ্যে ঢুকিয়ে, একদম বাসের দেয়ালে সাথে হাত আটকে গেলো।
নিশাত দাড়িয়ে শক্ত ভাবে চিৎকার করে বলল, ড্রাইভার সাহেব গাড়ি থামান।
ওর চিৎকার শুনে সবাই ওর দিকে তাকালো। ড্রাইভার বলল,দেখতো জামাইল্লা কি হইছে?
হেলপার ছুটে আসলো কি হয়েছে দেখতে, ওস্তাদ বিচার করছে।
নিশাতের বরাবর পিছনের সিটে সুদর্শন চেহারার অধিকারী এক পুরুষরুপী শয়তান ,কানে ইয়ারফোন
লাগিয়ে বসে ছিলো ।হাত আটকে গেছে আর নিশাত কে দাঁড়াতে দেখে শয়তান টা ও ওঠে দাঁড়ালো, হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না ।নিশাতের পাশে বসা মহিলা এ সব দেখে ভয় পেয়েছেন ।
উৎসুক কয়েকজন এগিয়ে ছিলো, কিন্তু নিশাত বলল, দেখে যান ,আমি একটা শয়তান ধরেছি।
এ কথা শুনে,এবার যারা এগিয়ে ছিল ,তারাও যার যার জায়গায় বসে রইল।
৪০-৫০ সিটের বাসে সব সিটে মানুষ, অর্ধেকের বেশি পুরুষ তবু কেউ এগোচ্ছে না।
নিশাত আবার বলল,বাসে কি কোন পুরুষ মানুষ আছেন ?
এবার সামনে থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক আসলো বলল, কি হয়েছে মা?
মাঝ থেকে এক পুরুষ এসে বলল, কি হলো বোন?
পিছন থেকে কলেজ পড়ুয়া এক ছেলে এসে বলল, কি হয়েছে আপু?
সবাই এসে চাকু দিয়ে আটকানো হাত দেখেলো , নিশাত বলল, শয়তান টা এই ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে শরীর স্পর্শ করার চেষ্টা করে, প্রথম বুঝতে পারিনি।
সরে বসাতে দেখি হাতটা আগের চেয়ে আর বেশি ঢুকিয়ে দিয়েছে আর আমি চাকু দিয়ে আটকাই।
এর মধ্যে শয়তান টা ও অবস্থা বুঝতে পেরে চেঁচিয়ে উঠল, ঐ আমার হাতে চাকু ঢুকাইছোছ কেরে ?
জানোছ আমি কেডা।
মোবাইল দিয়ে কাউকে কল দিতে চেষ্টা করলো, বয়স্ক চাচা ওর কলার ধরে বলল, জানোয়ার কাকে কল দেস?
একজন হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিলো।
মাঝবয়সী পুরুষটি চড় থাপ্পড় দিলো, শয়তান এমনিতে তোর হাত আটকাইছে, তুই সাধু ,তোর হাতে পাখা গজিয়েছে যে তোর থেকে উড়ে এখানে ঢুকে গেছে।
বয়স্ক চাচা বলল, আমি কর্নেল মতিউর রহমান তোদের মতো শয়তান শায়েস্তা করতে এখনো বেঁচে আছি ।
কোন ভয় নেই মা, তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়েছি, তোমাকে স্যালুট জানাই বলেই নিশাত কে স্যালুট জানালো ।
আমি সাংবাদিক শাহিন আহমেদ সাগর ,শয়তানের ছবি তুলে নিয়েছি, এমন শয়তানের মুখোশ খুলে ফেলার জন্য, আপনাকে ধন্যবাদ বোন।
আমাদের চারপাশে মানুষরুপী এমন নরপিসাচ বহুত আছে,এর শায়েস্তা হবেই ।

কলেজ পড়ুয়া ছেলেটি বলল, আমি রাশেদ, শয়তানটার শয়তানি ভিডিও করেছি , মানুষ জানবে ,দেখবে শয়তানির কি ফল। আপু আপনার কোন সমস্যা হবে না ,।
এসব শয়তানের জন্য আজকে আমাদের মা, বোন মেয়েরা নিরাপদ ভাবে বাঁচতে পারছে না। সামনে পুলিশ ফাঁড়ি, শয়তান টাকে পুলিশের কাছে দিবো।নিশাত বলল, আপনাদের ধন্যবাদ আমাকে সাহায্য করার জন্য, আপনাদের মতো মানুষ আছে বলেই হয়তো আমরা মেয়েরা বাইরের জগতে এখনো টিকে আছি।
নিশাত চাকু টা বের করে নিলো ।বয়স্ক চাচা নিশাত কে বলল, মা তুমি বাড়ি যাও ,আমরা এর ব্যবস্থা করছি, শয়তান টাকে ধরে নিয়ে ওরা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে নেমে পড়ল।
নিশাত সামনের একটা সিটে এসে বসল, হেলপার বলল,আপা আফনেগো মতো মাইয়া মানুষ এখন বহুত দরকার, নইলে এই হারামজাদা গুলার শায়েস্তা হইতো না। আমার ও একটা মাইয়া আছে , বড্ড ডর লাগে আপা, যা দিনকাল হইছে।
গাড়ির ভিতর সবাই চাপা স্বরে কথা বলছে ।এতক্ষণ, নিশাতের পাশে থাকা মহিলা কোন কথা বলেননি, উনি সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল, হাইরে পুরুষ মানুষ ,ওনারা খালি তিন জন ই পুরুষ আর বাকি আপনারা পুরুষ রূপে বেডি মানুষ , একটা মেয়ে যেখানে এত বড় সাহসের কাজ করছে আর আপনারা চাইয়া তা দেখছেন।আমার যদি এ মাইয়ার মতো সাহস থাকতো তবে আপনাদের ও চোখ গুলা গুতা করে দিতাম। মাগো তোমারে যে কি বলবো, আমি ভয় ই পাইছিলাম। সত্যিই তোমার মতো মেয়ে মানুষ সমাজের খুব দরকার ।তুমি বলেই হয়তো শয়তানটার শায়েস্তা হলো।

নিশাত বাড়ি ফিরে বাবাকে সব বলল, বাবা শুনে গর্ববোধ করে ও আবার বলল, মেয়েদের এত সাহস থাকা ভালো না মা।
ফেসবুকে রাশেদ শয়তানটার ভিডিও টা শেয়ার করে দিলো,ভিডিও তে শুধু শয়তান টার চেহারা দেখা যাচ্ছে, শয়তানকে ওরা পুলিশের কাছে দিলো ,প্রমাণ স্বরূপ এ ভিডিও দেখালো , পুলিশ মামলা নিয়ে জেলে বন্দি করলো।
পরদিন পত্রিকায় শয়তানটার ছবি সহ খবর বের হলো, কর্নেল চাচার সুপারিশে এর উচিত সাজা হলো। নিশাত সবার কাছে সাহসী মেয়ে হিসাবে পরিচিতি পেলো।

Hits: 8

Comments
Loading...