Hits: 8

ভালোবাসার গলিত হৃদপিন্ড

0

স্কুল থেকে ফিরছেন নাজিম সাহেব। স্ত্রীর ভালোবাসা মোড়ানো ফোন কল পেয়ে খুশি মনে রিসিভ করলেন। স্ত্রী তার পোয়াতি। মহা খুশিতে তাকে জানালো যে পেটের বেবিটা নাকি আজ নড়াচড়া বেশি করতেছে। কয়েকবার লাথিও মেরেছে নাকি। হালকা ব্যাথা কিন্তু তা সুখানুভূতিতে ভরা। এ যেন এক স্ববর্গীয় সুখ। গাড়ী থেকে নামলেন। তার বাসা মিজান রোড থেকে কয়েক মিনিটের হাটার পথ। প্রতিদিনকার মতো আজো হাটছেন আর মোবাইল ঘাটাঘাটি করছেন।

সামনে একটা ডাস্টবিনে হঠাত নজর গেল। কতগুলো কুকুর ঘেউ ঘেউ করে বাতাশ ভারী করে তুলছে। অারেকটু সামনে এগুলেন তিনি। দেখলেন দলা পাকানো লাল ফুটবলের মত একটা কিছু। পুরোটা কতগুলো পিপড়ের দখলে। হঠাৎ একটা কাকের ডানা ঝাপটানোর করনে পিপড়ের দল সরে গেল। বেরিয়ে এল মানব শিশুর হাতের মত কিছু একটা। রক্ত লেগে আছে তাতে। আঙুলগুলো অনেক ছোট। মানব শিশু দেখে চারপাশে এদদিক ওদিক তাকিয়েএকটু এগিয়ে গলেন কৌতুহল ও ভয় দুটোই লাগছে। সত্যিইতো। মানুষের বাচ্ছা! কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না নাজিম সাহেব। সাহস সঞ্চয় করে পকেটের রুমাল বের করে পিপড়েগগুলোকে তাড়ালেন।

না। বাচ্ছাটি বেচে নেই।তার হৃদপিন্ড, ফুসফুস এখন পোকার দখলে । এইতো সেদিন ক্লাশে ছাত্রছাত্রীদের হৃদপিন্ড পড়াচ্ছিলেন। কতবার আঁকার পরেও বোর্ডে সুন্দর করে সঠিক আকৃতি আঁকতে পারেননি তিনি। মহান আল্লাহ কত সুন্দর করে গড়েছেন এ মানব শরীর। হঠাৎ কেন যাননি তার কান্না পেয়ে গেল। নিজের স্ত্রী ও অনাগত বাচ্ছার কথা মনে পড়ে গেল। আর ভাবতে পারছেন না তিনি।চোখের কোন ঝাপসা হয়ে এল।কার বাচ্ছা, কোথাকার বাচ্ছা এখানে কি করে এল, এসব ভাবনায় ডুবে গেলেন তিনি। হঠাৎ খেয়াল করলেন প্রায় অর্ধগলিত বাচচ্ছাটির গলায় একটা চিরকুট ঝুলানো। একটি কালো সুতা দিয়ে বাধা। কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে চিরকুটটি নিলেন।

চারপাশে অনেক লোক জমা হয়ে গেল। কেওবা গলিত বাচচ্ছার মা বাবাকে গালি দিচ্ছে, কেওবা হায় হায়! করছে, কেওবা সমাজ নীতি নৈতিকতার বুলি অাওড়াচ্ছে। কেওবা কমিশনার বা পুলিশকে ফোন দিচ্ছে। সবাইকে সাইডে করে চিরকুটটি হাতে নিয়ে পড়ার জন্য বেরিয়ে এলেন বিড় ঠেলে। চারদিক থেকে আরো লোক জড়ো হচ্ছে।

চিরকুট খুলে প্রথম লাইনটি পড়েই নাজিম সাহেব তো থ। পড়তেছেন আর কাঁদছেন….
নাজিম সাহেব কাঁপা কাঁপা হাত নিয়ে অশ্রুসজল নয়নে চিরকুটটি পড়তে লাগলেন। পায়ের গতি স্লথ হয়ে আসছে তার।
রক্তের চোপ চোপ দাগ লেগে আছে চিরকুটে। অপরিপক্ক হাতের লেখা। কোন প্রাইমারীর বাচ্ছার লেখার মত। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় লেখা চিররকুটটি বানানে ভুলে ভরা। পাঠকের সুবিধার্থে প্রমিত ভাষায় চিরকুটটি ঠিক এরকম…… ”
আমি মরিয়ম। ফাজিলপুর আমার বাড়ি। গরিব বিধায় মা ফেনীতে কাকার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। বাবা মাকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছে জানিনা। গ্রামের দাদারা বলতেন
আমি নাকি অপয়া? আচ্ছা অপয়া কি?আমি নাকি আমার বাবার নিরুদ্দেশের জন্য দায়ী? আমার জন্মের দিনই বাবা মাকে ছেড়ে
কোথায় ছলে গেছেন। মেয়ে হয়েছে তাই। বাবাকে কখনো দেখিনি। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। একবার টানা ৫ দিন ঘরে কোন খাবার না থাকায় মা আমাকে কাকার সাথে শহরের কাকার
বাসায় কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে আমি শহরে।কাকা আমায় খুব আদর করেন। নিয়মিত খোজ খবর করেন। তিনি
খুব ভালো।চাচিমাও ভাল। তবে চাচার মত ভাল না। তার ছোট ছেলেটা মানে রাজু ভাইয়া খুব খারাপ। আমাকে শুধু শুধু কষ্ট দেন।ভাইয়া অনেক রাত পর্যন্ত পড়েন। তিনি কোন ভার্সিটি
নাকি কিসে পড়েন। আমি জানিনা। রাতে অামি ঘুমালে আমার রুমে এসে এসে শুধু কাতুকুতু দেন।আমার জামার ভিতরে হাত ডুকিয়ে দেন। একদিন অামাকে তিনি খুব কষ্ট দিয়েছেন। খুব
ব্যাথা পেয়েছিলাম। সারা রাত কেঁদেছিলাম। তিনি আমার সাথে নোংরামি করলেন। আমি কাকাকে বলে দেব বললে তিনি বলেছেন “আমাকে মরে ফেলবেন। কিছুদিন পররপর ভাইয়া
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমার রুমে এসে আমার সাথে নোংরামি করতেন। আমি ভয়ে আর কাওকে কিছু বলিনি। ৫/৬ মাস পরে একদিন খুব সকালে আমার প্রচন্ড পেটে ব্যাথা।
সাথে বমিও করতেছিলাম বাররবার। কাকা আফিস থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার পরিক্ষা নিররিক্ষা করে কি যেন বললেন কাকাকে। কাকা এসে আমার মাথায় হাত বুলোলেন। মুখটা তার মলিন। কিন্তু
কিছুই বললেন না। বাসায় ফেরার পর রাতে চাচি আমাকে কি কি অনেক কথা জিজ্ঞেস করে প্রচন্ড মারলেন। তিনি আগে কখনো আমায় মারতেন না এই প্রথম তিনি আমায় মারলেন। পরে
আমি ভাইয়ার কথা বলেছিলাম যে তিনি আমার সাথে রাতে মাঝে মাঝে যা কররতেন তা সব বলে দিলাম। তিনি শুধু বার বার একথা বললতে নিষেধ করতেছেন যেন রাজু ভাইয়ার বিষয়ে
কাওকে কিছু না বলি।একদিন রাতে আমাদের পাশের বাসার বুয়া আমায় বললেন যে
আমার পেটে নাকি ৬মাসের একটি বচ্ছা আছে। আমি বুঝতে পারছিনা আমার পেটে বাচ্ছা ডুকলে কিভাবে? সেজন্যইতো আমার পেটে ব্যাথা লাগে। আমার খুশি লাগছে যে কাকাদের
বাসায় আর কোন ছোট বাচ্চা নেই। তাহলে আমার একজন খেলার সাথী পাব। কি মজা কি মজা।! আমি তার নামও ঠিক করেছি।
নামম দেব তার টগর। সারাক্ষন তার সাথে খেলবো, হাসবো আরো কত কি করবো।
সেদিন কাকাদের বাসায় একজন ডাক্তার এলেন। আমাকে একটা ইনজেকশান দিয়ে ঘুমিয়ে দিলেন। সকাল হওয়ার আগেই
জেগে উঠলাম। দেখি আমার পাশে একটা দলা পাকানো ছোট বাচ্চা। আমি খুশি হলাম দেখে। কিন্তু ব্যাথায় উঠতে পারছিলাম না। পাশে ফিরে দেখি পাশে বাসার বুয়া আমার পাশে বসে কাঁদতেছেন। তিনি আমাকে বললেন এই তোমার
বাচ্ছা। মরে গেছে। মেরে ফেলা হয়েছে তাকে। আমার কাকা ও চাচি নাকি রাতে বাচ্চাটিকে বের করে মেরেছেন। বুয়া আমার সব কথাগুলো একটা কাগজে লিখে বললেন একটা সুতা
দিয়ে যেন চিরকুটটি বাবুর গলালায় বেধে দিই। তাতে নাকি কি উপকার হবে। বাচ্চাটা নাকি আবার বেচে উঠবে তাতে।ব্যাথায় আমি নড়তে পারচিনা। বুয়া আমার বাচ্চাটির গলায় ঝুলিয়ে কেন দিবেন বুঝতে পারছিনা। তবুও লিখলাম।

Hits: 8

Comments
Loading...