জীবনের পূর্ণতা (১)

0 ৫৫

 

পর্ব-১

প্রতিদিন ফজর পড়ে হাঁটতে বেরোন মাহবুবুর রহমান সাহেব ।ডায়াবেটিস হওয়ার পর থেকে নিয়মিত হাঁটেন তিনি,১ ঘন্টা হেঁটে বাসায় ফেরেন।বাসায় গিয়ে দেখেন ওনার স্ত্রী আমেনা বেগম নামাজ শেষ করে কোরআন পড়ছেন, সারা ওনার জন্য নাস্তা রেডি করে রেখেছে ।বাসার সবাই ততক্ষণে ওঠে গেছে।
ওনার ৪ সন্তান ,
বড় ছেলে কায়সার মাহমুদ -ব্যাংকে জব করে,
বড় ছেলের বউ সারা মেহবুবা -সরকারী কলেজের প্রফেসর ,
বড় মেয়ে আসমা কবির – স্বামী আশফাক কবির ,আর দু ছেলে আসিক, আসিফ কে নিয়ে আমেরিকা থাকে বছর পাঁচেক হলো।
ছোট ছেলে আরমান মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ে,
ছোট মেয়ে আফরিনা মাহবুব ক্লাশ টেনে পড়ে।
আর হ্যাঁ , বড় ছেলের ঘরের তিন নাতি-নাতনি,
প্রথম দুজন যময , নাতনি -মিরহা রহমান , নাতি- মেহরাব রহমান , ছোট নাতি – মেহরাজ রহমান ।

মাহবুব সাহেব কলিং বেল দিলেই মেহরাব দৌড়ে এসে দরজা খুলে দেয় ।
– আস্সালামুআলাইকুম দাদাজান।
– ওয়ালাইকুমুস্সালাম দাদা ভাই।
পিছন থেকে চোখ ডলতে ডলতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এসে মেহরাজ ও সালাম দেয় ।
– সারা এসে বলে আব্বুজি ফ্রেস হয়ে আসেন ,নাস্তা রেডি করে রেখেছি।
সকাল বেলাটা সারার ছোটাছুটি করে সব কাজ করতে হয়, সাথে ওর শ্বাশুরী, আফরিনা, রুমা খালা ও হেল্প করে। ফজরের নামাজ পরে সবার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করা, মাহমুদের -লাঞ্চ, প্রয়োজনীয় ফাইল ব্যাগে গুছিয়ে দেওয়া, মিরহা- মেহরাবের স্কুলের যাওয়ার জন্য সাহায্য করা, শ্বশুর শ্বশুরীর ও বাচ্চাদের জন্য ১১ টার নাস্তা তৈরি করে রাখা , দুপুরের রান্না রেডি রাখা ,নিজে রেডি হয়ে কলেজ যাওয়া।কলেজ থেকে এসে দুপুরের খাবার রান্না করা, মেহরাজ কে গোসল করানো ,নিজে গোসল করে নামাজ পরে এসে সবাইকে খাওয়ায়।
মেহরাজ কে ঘুম পারিয়ে, মিরহা-মেহরাব ,আফরিনা কে পড়ায়।
আসরের পরে বিকেলে সবার জন্য নাস্তা বানায় ।
এটা সারার প্রতিদিনের রুটিন ।
মাহমুদ, মাসুদ বাসায় ফিরে সন্ধ্যায়।
মাহমুদ ব্যাংক থেকে ফেরার পথে ওদের সুপার সপ্ টা ঘুরে আসে ,সারাদিন কি কেনা- বেচা হলো তা দেখে আসে।আর মাসুদ ক্লাশ শেষ করে একটা কোচিং এ ক্লাশ নেয়।
মাহবুব সাহেব দিনের অনেক টা সময় সুপার সপে ও বাসার সামনে নিজের হাতে করা বাগানে থাকেন ।
তিন তলা বাসার সামনে অনেক টুকু অংশে তিনি বাগান কেরেছেন।সকাল – বিকাল দাদা ,নাতি- নাতনি মিলে গাছের পরিচর্যা করেন। হরেক রকমের ফুল- ফলের ,সবজির গাছ।
রমজান মাসটা আসলেই বাসার সবাই অনেক খুশি হয়। রমজান মাসেকে ঘিরে সবাই মিলে অনেক পরিকল্পনা করে ।
রমজান মাস আসার আগেই অনেক কিছুর লিস্ট করা হয় ।
বাজারে সব দোকানদারদের ইফতার খাওয়ানো,
মসজিদে ইফতার পাঠানো,
গ্রামের গরিব মানুষদের রোজার বাজার পাঠানো ,
রহমত চাচা,করিম চাচা, দুলাল, রুমা খালার জন্য
রোজার বাজার পাঠানো,
বাসায় কিছু গরিবদের ইফতার করানো,
সবার জন্য ঈদের বাজার করা ।
রমজান মাসে সারার কলেজ ও আফরিনা স্কুল বন্ধ থাকে।
সারা শ্বাশুরীর সাথে সব কাজে সাহায্য করে , সেহেরির রান্না ও নিজেই করে , হরেক রকম ইফতার বানায়।ফাঁকে ফাঁকে ওর আম্মুর জন্য ও শ্বাশুরীর জন্য হিজাব, আসমা আপা ,আফরিনা ও ওর ছোট বোন সাবার জন্য থ্রিপিজ, মিরহা-মেহরাব ,মেহরাজের জন্য ঈদের জামা সেলাই করে ।
মিরহা-মেহরাব প্রতিদিন সকালে দাদাকে নতুন সূরা মুখস্ত করে শুনায় আর সবার কাজে সাহায্য করে।ওরা ক্লাস টু তে পড়ে।
এবারের রমজানের ওরা প্রতি শুক্রবার রোজা রাখছে।২০ রমজানের ওদের স্কুল ছুটি দিলো।
আজ স্কুল ছুটির শেষে বাসায় ফিরে মিরহা দৌড়ে সারার কাছে আসলো,
– জানো আম্মু আজ স্কুলে কি হয়েছে ? আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে তোহার সাথে ধাক্কা লেগে পরে যাই ,ভাইয়া দৌড়ে এসে আমাদের তুলে , আর আমাকে জরিয়ে ধরে বলে ,কেন ধাক্কাধাক্কি করে নামছিলাম?এজন্যই তো পরে গেছি ,আর যেন কখনো এভাবে না নামি,মিরহা তুমি আমার বোন তুমি ব্যথা পেলে যে আমার ও ব্যথা লাগে।আর আমাদের সব বন্ধুদের বলল, আমরা যদি এমন করে নেমে ব্যথা পাই ,তাহলে তো আব্বু- আম্মু ও অনেক কষ্ট পাবেন।
ভাইয়ার কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে আসলো, আর গর্বে আমার বুকটা ভরে ওঠলো
আমার ভাইয়া টা কত ভালো, অনেক ভালোবাসে আমাকে । আমি ও ভাইয়া কে অনেক ভালোবাসি আম্মু ।
একদমে সব গুলো কথা বলল মিরহা ।
সারা মিরহা কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল – মেহবরাব এসব বলেছে , কোথায় ও ?
– পিছন থেকে মেহরাবও মাকে জড়িয়ে ধরে ।
– সারা বলল, শোন পৃথিবীতে পবিত্র সম্পর্কের মধ্যে অন্যতম হলো ভাইবোনদের সম্পর্ক, ভাই সবসময় বোনকে ভালবাসবে ,আদর করবে ,বোনের ভালো মন্দ দেখবে।দেখছো তো তোমাদের আব্বু ও তো তোমাদের ২ ফুফিকে কত আদর করে ।কত কিছু উপহার দেয় ।বোন ও ভাইকে ভালোবাসবে , ভাইয়ের কথা শুনবে , ভাইদের আদর করবে , এটিই তো নিয়ম।
সারা ওদের দুজনের কপালে চুমু দেয়, ওরাও খুশিতে সারা কে জড়িয়ে ধরে চুমু দেয় ।
– যাও তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নাও দাদাভাইয়ের সাথে বাহিরে যেতে হবে,তোমার দাদাভাই আজ যাকাত দিতে যাবেন ।
ওরা চলে যেতেই সারার সালমানের কথা মনে পড়ল, সালমান ওর ছোট ভাই, ওদের দু বোনের এক ভাই, মাসুদ আর সালমান একসাথে ভার্সিটিতে পড়ে ।
সালমানের যখন জন্ম হয় তখন সারা ক্লাশ ফাইভে পড়ে, সালমান কে পেয়ে সারা আর সাবা মহা খুশি ছিল ।সারাদিন সালমান কে নিয়ে ই থাকতো ,বড় হয়ে সালমান ও আপুদের কথা শুনে , ও আপুদের মতো মেধাবী । বিশেষ করে সারা কে ওর মনের কথা সব শেয়ার করে।মাসুদ ও সালমান ছোট থেকে একসাথে পড়ছে, স্কুল, কলেজ ,এখন ভার্সিটি।
সালমান ও মাসুদের বন্ধুত্বের খাতিরেই সারা আর মাহমুদের বিয়ে হয় ।
দুটো পরিবার কে এখন একসাথে একটা বড় পরিবার বলা চলে , আনন্দ, খুশি ,কষ্ট সবাই একসাথে মিলে মিশে ভাগ করে নেয়।
– বিকেলে অফিস থেকে ফিরে এসে মাহমুদ সারা কে বলল, ওর অফিসের দারোয়ান আফজল ভাইয়ের আব্বা স্ট্রোক করেছেন, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, অনেক টাকা লাগছে ওরা সব কলিগের মিলে হেল্প করবে।
– বেশ তো আমার কাছেও কিছু টাকা আছে ,লাগলে নিয়ো।
– তুমি ঈদের জামা তো কিনোনি , ঐ দিন সবার জন্য জমা কাপড় কিনলে , বললে পরে কিনবা….
এখন না নেওয়ার চিন্তা করছো ,বুঝতে পারছি ।
সারা তোমার সাথে আর পারিনা ,সারাক্ষণ কার কি লাগবে সেটাই ভাবতে থাকো ,নিজের বেলায় ফাঁকি ।
– সারা মাহমুদ কে জড়িয়ে ধরে বলল,আমার তো তুমিই আছো … এই গোটা পরিবার টা ও আমার… আমার আর কিছুই চাই না জনাব।
– আর জামার কথা বলছো ?
গত মাসে আমার আর আসমা আপার জন্য আম্মু যে জামা দিয়েছেন সেটাই তো রয়েছেই, এখনো সেলাই করিনি ।দেখি ওদের গুলো শেষ করে আমার টা বানাবো।
– সারা তুমি কি করে যে সব করো , ভেবেই পাই না ।তুমি এত উদার বলেই সবদিক সামলাতে পারছি।মাহমুদ গেয়ে ওঠে
“তুমি আছো তাই ,এত ভালোবাসা পাই
তুমি আছো বলে তাই ,আমি ভালোবেসে যাই “।
– হয়েছে, আর আমার গুন গাইতে হবে না ।ইফতারের সময় হয়ে এলো , আসো তাড়াতাড়ি ।
-আর আসমা আপা কল দিয়েছিলেন, বলল আগামী সপ্তাহে আসছেন ওনারা।
– ইফতারের পর সবাই বসে আলোচনা করে সবে কদ্বর নিয়ে ।

Hits: 5

Comments
Loading...