Hits: 0

মোড়লবাড়ির বিয়ে

0

তারও তো একটা উদর আছে। গরীব বলে সেটা তো বসে নেই। সহায়-সম্পত্তিতে সে যে এতিম, সেটা তো পেটের বুঝাবার কথা নয়। এসব কি মনোজগতের চুলায় তাপ দিতে জানে ওপরতলার লাট সাহেবরা? দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের আন্দারপাড়া গ্রামে বসে বসে ভাবছে ভিটেবাড়ি হারানো নি:স্ব মাকসুদ। যদিও এলাকাবাসী নামের বিকৃতি ঘটিয়ে তাকে মাক্কু নামে ডেকেই মজা পায়! খানিকটা অপমানজনক তথাপিও সেদিকে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আগে তো পাকস্থলি বাচুঁক, তারপর না নামটাম দেখা যাবে! ওদিকে পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই বাবা পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন আর কৈশোর অতিক্রান্তের সময় মা নিজের আখের গোছাতে অন্যের হাত ধরে ভিন্ন স্বপ্নের পথ ধরেছেন! পুরোপুরি বেওয়ারিশ মাকসুদের শেষ আশ্রয়স্থল দু:সম্পর্কের এক মাতামহ। নি:সন্তান মাতামহ এলাকার মোড়লবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন।

তাদের দয়া-দখিনার দিকে-ই চেয়ে থাকতে হয় মাকসুদের। সকালে পান্তা ভাতের সাথে কাঁচা মরিচ, দুপুরে মোড়লবাড়ি ফিরত বাসী ভাত আর রাত্রে আঠা সিদ্ধ পায়েস খেয়ে-ই জীবন চলছে মাকসুদ-মাতামহের। যেন দিন আনে দিন খায়। কখনো আবার নুন আনতে পান্তা ফুরায়ের মতো অবস্থা। একদিন কাজে না গেলে পরের দিন অঘোষিত রোযা পালন করতে হয়! তারপরও দু’চালার নিচে নাতী-নানীর ছোট্ট সংসার কোনো রকমে চলছে আর কি। হঠাৎ একদিন নানী জানাল আগামী শুক্রবার মোড়লের বড় মেয়ের বিয়ে। পাত্র ঢাকার আলিশান বাড়িতে থাকে আর মস্তবড় এক চাকরি করে। কিছু না বলেই মাকসুদের জিভটা কেমন জানি করছে! বহুদিন পর পেট-পিঠ-গলা ভরে খাবে।

আহা, কি শান্তি লাগবে। পরক্ষনেই চোখে ভেসে ওঠছে সুস্বাদু খাবার। টেবিলভর্তি সাজানো বাহারি আইটেম,  দই-মিষ্টি, ড্রিংকস তারপরও খয়ের আর মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান। চেয়ারে বসে বসে পান চিবাবে আর তুপ্তির ঢেকুর তুলবে। ইস, ভাবতেই জিভ ভিজে যাচ্ছে তার। স্বপ্নের রাজ্য থেকে  মুখ ঘুরিয়ে মাকসুদ, তা নানু শুক্রবার কখন মোড়লবাড়িতে যাব আমরা? বলতে গিয়ে তার চোখ ‍দুটো আটকে গেল নানীর চেহারায়। একি, নানী তোমার আবার কি হলো? মুখটা এমন মরা মরা কইরা রাখছো কেন? আজ বুঝি মোড়লবাড়ির লোকজন তোমার জন্য না রেখেই সব খেয়ে ফেলছে নাকি কম রেখেছে? নানীর আর তর সইল না। চামড়ায় ভাঁজ পরা গাল বেয়ে একটানা পানি গড়িয়ে পড়ছে।

পিচ্চি নাতীটাকে কিভাবে বলবে। তারা যে গরীব, তাদের সবজায়গায় যেতে মানা, তারা সমাজের নিচুজাত! তাদের উপস্থিতি সমাজের একশ্রেনীর বড়লোকদের সম্মানহানি ঘটায়! নানী নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে, নারে কাঁদছিনা। মাত্রই পেঁয়াজ কেটে আসলাম তো, তাই চোখ বেয়ে পানি ঝরছে! বাহরে, আমি দেখলাম তোমার চোখ পানিতে চুবে গেছে, আর তুমি বলছো কাঁদছি না। নানু বলোনা কি হয়েছে? তোমার কষ্ট দেখলে আমারও খুব খারাপ লাগে। তুমি ছাড়া যে এই নিরামিষ দুনিয়ার আমার কেউ নেই। তুমি কাঁদলে আমি সইতে পারিনা। প্রায় একযুগ ধরে মোড়লবাড়িতে কাজ করছি, কোনোদিন চুরিচুট্টামি করিনি, যখন যেটা বলছে আর যেভাবে বলছে ঠিক সেভাবেই কাজ করেছি। তারপরও ওরা এমনটা কেন করলো রে?

আমরা তো গরীব, ওই অহংকারটা আমাদের সাথে দেখিয়ে কি লাভ? ভেবেছিলাম তোকে নিয়ে বিয়ের দিনটিতে মন মতো খাবো, ঘুরবো, শহরের কত্ত বড় বড় লোকদের দেখব, তারা কিভাবে কথা কয়, হাসে আরও কতকিছু! কিন্তু সেইসব বুঝি আমাদের ভাগ্যে নাই রে। আজ বিকালে কাজ শেষে ফিরার পথে মোড়ল বলল, তুমি কিন্তু বিয়ের দিন অত্র এলাকায় আসবা না। শহরের নামীদামী লোক আসব, তুমি বরং পরের দিন আইসা সবকিছু পরিষ্কার কইরা দিয়া যাইও। বলতে বলতে নানী হাউমাউ করে কেঁদে ওঠল। আমি বুড়া, অতটা পয়-পরিষ্কার বুঝিনা, আমারে ওরা নাই বললো, তোরে তো একটু যাইতে কইতে পারতো।  যেন বাচ্চা শিশুর মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে ৭০ বয়স্কা বৃদ্ধা।

মুখ বাকিয়ে মাকসুদ ঝড়ের বেগে নিজের বাম চোখের পানি মুছে ফেলল যেন প্রিয় নানী ধরতে না পারে। অনেকটা জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে নানীর কাপড়ের আচল দিয়ে নানীর চোখ দুটো মুছে দিয়ে বলল। আরে তাতে কি হয়েছে। আমরা নিচুজাতের মানুষ, ওরা তো ধনী বড় সাহেব! আমাদের জন্য ঔসব খাবার কি শোভা পায়? আমরা তো মাটির সানকিতে ভাত খাওয়ার জন্যই জন্মেছি, ওইসব রাজকীয় টেবিলে বসে খাওয়ার যোগ্যতা আমাদের নেই। তা চেয়ে বরং চলো, আমরা ভিন্ন কিছু করি, গত কয়েকদিন যাবত রাস্তায় কাগজ টুকিয়ে আমি কিছু টাকা জমিয়েছি। তা দিয়ে বাজার থেকে একটু সেমাই আর চিনি কিনে আনব, তারপর তুমি আর আমি মজা করে খাবো। নাম দিব বুয়া বাড়ির বিয়ে!

 

Hits: 0

Comments
Loading...