মাতা–পিতার সাথে সদ্ব্যবহার

0 ৪০

১. মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, এ উত্তম ব্যবহারের সুযোগ উভয় জাহানের জন্যে সৌভাগ্য মনে করবে, আল্লাহর পর মানুষের ওপর সব চাইতে বড় অধিকার হলো মাতা-পিতার। মাতা-পিতার অধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহর অধিকারের সাথে বর্ণনা করেছেন এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নির্দেশের সাথে সাথে মাতা-পিতার কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নির্দেশ ও দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন-

“আর তোমার প্রতিপালক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং মাত-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে”।

(সূরায়ে বনী ইসরাইল)

“হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ বলেছেন, একদা রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়? রাসূল (সাঃ) বললেন, নামায সময় মত পড়া। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,এর পর কোন কাজ আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এর পর কি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা”।

(বুখারী, মুসলিম)

হযরত আবদুল্লাহ বলেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বলা আরম্ভ করলো আমি আপনার সাথে হিজরত ও জিহাদের জন্যে বাইয়াত করছি। আর আল্লাহর নিকট এর সওয়াব চাই। রাসূল (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা-পিতার মধ্যে কেউ কি জীবিত আছেন? সে বলল, জ্বী, হ্যাঁ, তাদের উভয়ই জীবিত আছেন। তিনি বললেন, তা হলে তুমি কি সত্যি আল্লাহর নিকটে তোমার হিজরত ও জিহাদের পুরস্কার চাও? সে বলল, জ্বী, হ্যাঁ, আমি আল্লাহর নিকট পুরস্কার চাই। রাসূল (সাঃ) বললেন, “যাও তোমার মাতা-পিতার খেদমতে থেকে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার কর”।

(মুসলিম)

হযরত আবু উমামা বলেছেন, “এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! সন্তানের উপর মাতা-পিতার কি অধিকার? তিনি বললেন, “তারাই তোমার বেহেশত এবং তারাই তোমার দোযখ”।

(ইবনু মাজাহ)

অর্থাৎ তুমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে বেহেশতের অধিকারী হবে এবং তাদের অধিকারসমূহকে পদদলিত করে দোযখের ইন্ধনে পরিগণিত হবে।

২. মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। উপকারীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও ভদ্রতা প্রধান কর্তব্য এবং ইহা প্রকৃত সত্য যে, আমাদের অস্তিত্বের বাহ্যিক অনুভূতির কারণ হলো মাতা-পিতা। অতঃপর তাদের লালন-পালন থেকে আমরা লালিত-পালিত হয়ে বড় হই এবং বোধ জ্ঞান সম্পন্ন হই। তাঁরা যে অসাধারণ ত্যাগ, অনুপম চেষ্টা ও অত্যন্ত ভালবাসার সাথে আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তার দাবী হলো, আমাদের বক্ষস্থল তাঁদের আন্তরিক ভরসা মাহাত্ম্য ও ভালবাসায় মশগুর থাকবে এবং অন্তরের প্রতিটি তন্ত্রী তাদের কৃত্জঞতায় আবদ্ধ থাকবে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা নিজের কৃত্জ্ঞতা স্বীকারের সাথে সাথে মাতা-পিতার কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নির্দেশ দিয়েছেন-

আরবি

“আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং মাতা-পিতারও। (লোকমান)

৩. মাতা-পিতাকে সর্বদা সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করবে। তাদের ইচ্ছা ও মেজাজের বিপরীত এমন কোন কথা বলবে না যা দ্বারা তারা তাদের অন্তরে ব্যথা পায়। বিশেষতঃ বৃদ্ধাবস্থায় যখন তাদের মেজাজ বা স্বভাব খিটখিটে হয়ে যায়, তখন মাতা-পিতা এমন কিছু দাবী করে বসে যে, যা অবাস্তব। এমতাবস্থায় তাদের প্রতিটি কথ সস্তুষ্টচিত্তে সহ্য করবে এবং তাদের কোন কথায় বিরক্ত হয়ে এমন বলবে না যা দ্বারা তাদের অন্তরে ব্যথা পায় এবং তাদের আবেগে আঘাত লাগে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন-

আরবি

“তাঁদের একজন বা উভয়জন যদি তোমার কাছে বৃদ্ধাবস্থায় থাকে তখন তাদের আচরণে রাগ করে উহ করবে না এবং তাদেরকে ধমকও দেবে না”।

মূলতঃ এ বয়সে কথ সহ্য করার শক্তি থাকে না, দুর্বলতার কারণে নিজের গুরুত্ব প্রাধান্য পায়, এর ফলে সাধারণ কথাও কর্কশ অনুভূত হয়, সুতরাং এ নাজুক অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে নিজের কোন কথা বা কাজে মাতা-পিতাকে অসন্তুষ্টই হবার সুযোগ দেবে না।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “পিতার সন্তুষ্টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি”।

(তিরমিযি, ইবনে হাব্বান, হাকেম)

অর্থাৎ-কেউ যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চায় সে যেন পিতাকে সন্তুষ্ট করে, পিতাকে অসন্তুষ্ট করলে সে আল্লাহর গযব ও আযাব ডেকে আনে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকৈ বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি মাতা-পিতাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় রেখে রাসূর (সাঃ)-এর কাছে হিজরতের ওপর বাইয়াত করার জন্যে উপস্থিত হলো। তখন রাসূল (সাঃ) বললেনঃ যাও তোমার মাতা-পিতার নিকট ফিরে যাও, তাদেরকে তেমনিভাবে সন্তুষ্ট করে এসো যেমনিভাবে তাদেরকে কাঁদিয়েছিলে।

(আবু দাউদ)

৪. মনে প্রাণে মাতা-পিতার খেদমত করবে। আল্লাহ যদি তোমাকে এ সুযোগ দিয়ে থাকেন তা হলে তোমাকে যেন এ তাওফীক দান করেছেন যে, তুমি নিজেকে বেহেশতের অধিকারী ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অধিকারী করতে পার। মাতা-পিতার খেদমত দ্বারাই ইহকাল ও পরকালের পুণ্য, সৌভাগ্য এবং মহত্ব অর্জিত হয় এবং উভয় জগতের বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার বয়স এবং জীবিকা বাড়াতে চায় সে যেন তার মাতা-পিতার সাথে সৌজন্যমূলক ব্যবহার ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে”।

(আততারগীব ওয়াততারহীব)

রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ “সে ব্যক্তি অপমানিত হোক, আবার সে অপমানিত হোক এবং আবার সে অপমানিত হোকঅ সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে সে ব্যক্তি? তিনি উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেলো অথবা তাদের কোন একজনকে পেলো-তারপরও (তাদের খেদমত করে) বেহেশতে প্রবেশ করতে পারেনি”।

(মুসলিম)

এক জায়গায় তো তিনি মাতা-পিতার খেদমতকে জিহাদের মত মহান ইবাদতের সাথেও স্থান দিয়েছেন এবং এক সাহাবীকে জিহাদে যাওয়া থেকে বিরত করে মাতা-পিতার খেদমত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে গিয়ে জিহাদে শরীক হবার উদ্দেশ্য প্রকাশ করলো। রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা-পিতা কি জীবিত আছে? সে উত্তর দিল, জ্বী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, যাও আগে তাদের খেদমত করতে থাক, এটাই তোমার জিহাদ।

(বুখারী, মুসলিম)

৫.মাতা-পিতাকে আদব এবং সম্মান করবে এবং এমন কোন কথা বা কাজ করবে না যার দ্বারা তাদের সম্মানের হানি হয়।

আরবি

“তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলবে”।

একবার হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি চান যে, দোযখ থেকে দূরে থাকুন এবং বেহেশতে প্রবেশ করুন? ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই! হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) আবারও জিজ্ঞেস করলেন, আপনার মাতা-পিতা জীবিত আছে। ইবনে ওমর (রাঃ) বললেন, আপনি যদি তাঁদের সাথে নম্র ব্যবহার করেন তাঁদের খোরপোষের দিকে খেয়াল রাখেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি বেহেশতে প্রবেশ করবেন। তবে শর্ত হলো যে, কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে”।

(আল আদাবুল মুফরাদ)

৬. মাতা-পিতা সাথে বিনয় ও নম্র ব্যবহার করবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন-আরবি

“তাদের (মাতা-পিতার) সাতে বিনয় ও নম্রতাসুলভ আচরণ করবে।

বিনয় ও নম্র ব্যবহারের অর্থ হলো সব সময় তাঁদের মর্যাদার প্রতি খেয়াল রাখবে, কখনো তাদের সামনে নিজের বাহাদুরী প্রকাশ করবে না এবং তাঁদের মর্যাদা হানিকর কোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে।

৭. মাতা-পিতাকে ভালবাসবে এবং তাদেরকে নিজের সৌভাগ্য ও পরকালে পুরস্কার লাভের জন্য মনে করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

“যে নেক সন্তান মাতা-পিতার প্রতি একবার ভালবাসার দৃষ্টিতে তাকাবে আল্লাহ তা’আলা প্রতিদানে তাকে একটি মকবুল হজ্বের সওয়াব দান করবেন। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। কেউ যদি দয়া ও ভালবাসার সাথে একদিনে একশতবার দেখে? তিনি বললেন, জ্বী, হ্যাঁ, কেউ যদি একশতবার এরূপ করে তবুও। আল্লাহ তোমাদের ধারণা থেকে অনেক প্রশস্ত এবং সংকীর্ণতা থেকে পবিত্র”।

(মুসলিম)

৮. মনে-প্রাণে মাতা-পিতার আনুগত্য করবে। এমনকি তারা যদি কিছুটা সীমালংঘনও করে তবুও সন্তুষ্টচিত্তে তাদের আনুগত্য করবে, তাদের মহান উপকারসমূহের কথা চিন্তা করে তাদের কোন দাবী যদি তোমার রুচি ও স্বভাব বিরোধী হয় তবুও তা সন্তুষ্টচিত্তে পূরণ করবে, তবে তা দীনি বিধানসম্মত হওয়া চাই।

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, ইয়ামনের এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হলো, রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়ামনে তোমার কেউ আছে? লোকটি উত্তর দিল, আমার মাতা-পিতা আছে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারা তোমাকে অনুমতি দিয়েছে কি? সে বলল, না, তিনি বললেন, আচ্ছা, তা হলে তুমি ফিরে যাও এবং মাতা-পিতার কাছ থেকে অনুমতি নাও। তারা যদি অনুমতি দিয়ে দেয় তাহলে জিহাদে শরীক হবে নতুবা তাদের খেদমত করতে থাক।

(আবু দাউদ)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত ,রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি এমন অবস্থায় ভোর করলো যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র কুরআনে মাতা-পিতা সম্পর্কে বর্ণিত নির্দেশগুলেঅ ঠিক ঠিক পালন করেছে তা হলে সে এমন অবস্থায় ভোর করেছে যে, তার জন্যে বেহেশতের দু’টি দরজা খোলা হলো। আর মাতা-পিতার মধ্য থেকে একজন জীবিত থাকলে খোলা হলো এক দরজা। আর যে ব্যক্তি এ অবস্থায় ভোর করলো যে, তার মাতা-পিতা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে সে এমন অবস্থায় ভোর করলো যে, তার জন্যে দোযখের দুটি দরজা খোলা এবং মাতা-পিতার মধ্য থেকে একজন জীবিত থাকলে দোযখের একটি দরজা খোলা হলো। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, আয় আল্লাহর রাসূল! মাতা-পিতা যদি তার সাথে সীমা অতিক্রম করে তবুও কি? আল্লাহর রাসূল বললেন, তবুও। যদি সীমা অতিক্রম করে তবুও। যদি সীমা অতিক্রম করে তবুও।

(মেশকাত)

৯.মাতা-পিতাকে তোমার ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিক মনে করবে এবং তাদের ন্যে খরচ করবে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

“লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কিসে খরচ করবে? আপনি তাদেরকে বলে দিন, যা খরচ করবে তার প্রথম হকদার হল মাতা-পিতা”।

(সূরা বাকারা)

একবার রাসূল (সাঃ) এর দরবারে এক ব্যক্তি এসে তার মাতা-পিতার সম্পর্কে ফরিয়াদ করলো যে, সে যখন ইচ্ছে তখনই আমার ধন-সম্পদ নিয়ে নেয়। রাসূল (সাঃ) তার পিতাকে ডেকে পাঠালো। এক বৃদ্ধ দুর্বল ব্যক্তি এসে উপস্থিত হলো। আল্লাহর রাসূল তাকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন সে বলা শুরু করলোঃ

“আয় আল্লাহর রাসূল! এমন এক সময় ছিল যখন এ ছেলে ছিল দুর্বল ও অসহায়, আমি ছিলাম শক্তিমান। আমি ছিলাম ধনী আর এ ছিল শূন্য হাত। আমি কখনও আমার সম্পদ নিতে বাধা দেইনি। আজ আমি দুর্বল আর এ শক্তিশালী। আমি শূন্য হাত আর এ ধনী। এখন সে তার সম্পদ আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে।

বৃদ্ধের এ সকল কথা শুনে দয়াল নবী কেঁদে দিলেন আর বৃদ্ধের ছেলেকে সম্বোধন করে বললেন, “তুমি এবং তোমার ধন-সম্পদ সবই তোমার পিতার”।

১০. মাতা-পিতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, তাদের সম্মান সম্ভাষণ ও খেদমত করতে থাকবে। তবে সে যদি শিরক ও গুনাহের নির্দেশ দেয় তাহলে তারেদ আনুগত্য অস্বীকার করবে এবং তাদের কথা বা নির্দেশ পালন করবে না।

“মাতা-পিতা যদি কাউকে আমার সাথে শরীক করার জন্যে চাপ প্রয়োগ করে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তাদের কথা কখনও মানবে না আর পার্থিব ব্যাপারে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে”।

(সূরা লুকমান)

হযরত আসমা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ)-এর জীবিতাবস্থায় আমার মাতা মুশরিক থাকা কালীন আমার নিকট আসে, আমি রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে আরজ করলাম, “আমার মাতা আমার নিকট এসেছে অথচ সে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন। সে ইসলামকে ঘৃণা করে, এমতাবস্থায়ও কি আমি তার সাথে সদ্ব্যবহার করবো? রাসূল (সাঃ) বললেন, অবশ্যই তুমি তোমার মায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে থাকো”।

(বুখারী)

১১. মাতা-পিতার জন্যে নিয়মিত দোআ করতে থাকবে, তাদের অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে দোআ করবে এবং অত্যন্ত আন্তরিকতা ও আন্তরিক আবেগের সাথে তাদের দয়া ও ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করবে।

আল্লাহ পাক বলেন-

আরবি

“আর এ দোআ কর, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো যেমনি তারা আমাকে শৈশবকালে প্রতিপালন করেছিল”।

অর্থাৎ-হে প্রতিপালক! শৈশবকালে নিরুপায় অবস্থায় তারা যেভাবে আমাকে দয়া ও করুণা, চেষ্ট তদবীর, এবং মহব্বত ও ভালবাসা দিয়ে লালন-পালন করেছে এবং আমার জন্যে তাদের সুখ শান্তি পরিহার করেছে, আয় আল্লাহ! এখন তারা বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ও নিরুপায় হয়ে আমার থেকে বেশী দয়া ও করুণার মুখাপেক্ষী, আয় আল্লাহ! আমি তাদের প্রতিদান দিতে সক্ষম নই। তুমিই তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করো এবং তাদের দুরাবস্থার প্রতি রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করো।

১২. মায়ের খেদমতের দিকে খেয়াল রাখবে বিশেষভাবে। মা স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও অনুভূতিশীল হয়ে থাকে। তিনি সেবা-যত্ন ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশী মুখাপেক্ষী, আবার তাঁর অনুগ্রহ ও ত্যাগ পিতার তুলনায় অনেক বেশী, অতএব ইসলাম মায়ের অধিকার বেশী দান করেছেন এবং মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ দান করেছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-

“আমি মানুষদেরকে মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি, তার মা তাকে পেটে ধারণ করেছে, প্রসবকালে কষ্ট করেছে, পেটে ধারণ এবং দুধ পানের এ সময় হলো ত্রিশ মাস”।

(সূরায়ে আহকাফ)

পবিত্র কুরআনে মাতা এবং পিতা উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে বিশেষভাবে পর্যায়ক্রমে মায়ের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার চিত্রগুলো প্রভাব বিস্তারকারী দৃষ্টিতে তুল ধরেছেন এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে মানবিক দিক থেকে এ সত্য উদঘঅটন করেছেন যে, প্রাণ উৎসর্গকারিণী মাতা, পিতা থেকে আমাদের খেদমত ও সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশী অধিকারিণী মাতা, পিতা থেকে আমাদের খেদমত ও সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশী অধিকারিণী আবার রাসূল আকরাম (সাঃ) এ সত্যকে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)-এর দরাবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সব থেকে বেশী অধিকারী কোন ব্যক্তি? রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমার মাতা। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলো, অতঃপর কে? তিনি (সাঃ) উত্তর দিলেন, তোমার মাতা। লোকটি পুনঃ জিজ্ঞেস করলো, অতঃপর কে? তখন তিনি বললেন, তোমার পিতা।

(আল আদাবুল মুফরাদ)

হযরত জাহেমাহ (রাঃ) নবী করীম (সাঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার ইচ্ছা যে আমি আপনার সাথে জিহাদে অংশ গ্রহণ করবো, এখন এ ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণের জন্য আপনার নিকট এসেছি বলুন কি নির্দেশ? রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা জীবিত আছেন? জাহেমাহ (রাঃ) বললেন, জ্বী, জীবিত আছেন। রাসূল (সাঃ) বললেন, তাহলে ফিলে যাও, তার খেদমতে লেগে থাকো, কারণ বেহেশত তাঁর পায়ের নিচে।

(ইবনে মাজাহ, নাসায়ী)

হযরত ওয়াইস ক্বরণী (রহঃ) রাসূল (সাঃ)-এর যুগে জীবিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর সাক্ষাত পেয়ে ধন্য হতে পারেন নি। তার এক বৃদ্ধা মাতা ছিলেন, রাতদিন তাঁর খেদমতে লেগে থাকতেন। তার নবী করীম (সাঃ)-কে দেখার বড়ই আকাংখা ছিল। সুতরাং হযরত ওয়াইস ক্বরণী (রহঃ) রাসূল (সাঃ)-এর সাথে দেখা করতে আসতেও অনুমতি চেয়েছিল। রাসূল (সাঃ) নিষেধ করলেন। হজ্ব পালনেরও তার অত্যন্ত আগ্রহ থাকা সত্বেও যতদিন তাঁর মা জীবিত ছিলেন ততদিন তাঁকে একাকী রেখে যাওয়ার চিন্তায় হজ্ব করেননি। তার মৃত্যুর পরই এ আগ্রহ পূরণ করেন।

১৩. দুধ মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, তাঁর খেদমত করবে এবং তাকে সমান মর্যাদা দান করবে। হযরত আবু তোফাইল (রাঃ) বলেন, আমি জে’রানা নামক স্থানে দেখতে পেলাম যে, রাসূল (সাঃ) গোস্ত বন্টন করছেন। এমতাবস্থায় এক বৃদ্ধা এসে রাসূল (সাঃ)-এর একেবারে নিকটে চলে গেলেন। তিনি তার বসার জন্যে নিজের চাদর বিছিয়ে দিলেন, তিনি তার ওপর বসে পড়লে আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ মহিলাটি কে?” লোকেরা উত্তর দিল যে, ইনি রাসূল (সাঃ)-এর দুধ মা।

(আবু দাউদ)

১৪.মাতা-পিতার মৃত্যুর পরও তাদেরকে মনে রাখবে এবং সদ্ব্যবহার করার জন্যে নিম্নের কথাগুলোর প্রতি সংকল্প থাকবে।

(i)মাতা-পিতার মাগফিরাতের জন্যে সর্বদা দোআ করবে। পবিত্র কুরআনে মুমিনদেরকে এ দোআ শিক্ষা দেয় হয়েছে।

“হে আমাদের প্রতিপালক!আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে কিয়ামতের দিন ক্ষমা করে দিন”।

হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তি যখন তার প্রাপ্ত মর্যাদা দেখতে পায় তকন আশ্চর্য্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, এটা কিভাবে হলো? আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর দেয়া হয় যে, তোমার সন্তানেরা তোমার জন্যে সর্বদা আল্লাহর দরবারে মাগফিরাতের দোয়া করছে এবং আল্লাহ তা কবুল করেছেন।

হযরত আবু হুরাইরাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- মানুষ মারা গেলে যখন তার আমলের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়, শুধু তিনটি এমন কাজ আছে যা মৃত্যুর পরও উপকারে আসে, (ক) ছদকায়ে জারিয়া,অর্থাৎ এমন নেক কাজে দান করা যা মৃত্যুর পরও চলতে থাকে, (খ) তার ইলম যা হতে লোক দীনি উপকার পায়, (গ) সেই নেক্কার সন্তানেরা যারা তার জন্যে মাগফিরাতের দোআ করতে থাকে।

(ii)মাতা-পিতার কৃত ওয়াদা ও অছিয়ত পূরণ করবে। মাতা-পিতা জীবনে অনেক লোকের সাথে ওয়াদা করতে পারে, আল্লাহর সাথে কোন ওয়াদা করতে পারে, তাদের যিম্মায় ঋণ থাকতে পারে যা তারা আদায় করার সুযোগ পায়নি, মৃত্যুকালে কোন অছিয়ত করতে পারে, অবশ্যই সন্তান তার ক্ষমতানুযায়ী সেগুলো পূরণ করবে।

(iii) পিতামাতার বন্ধু বান্ধবের সাথেও সদ্ব্যবহার করবে। তাদের সম্মান করবে, তাদের সাথে পরামর্শ করবে এবং নিজে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় সম্মানিত ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ করবে। তাদের মত ও পরামর্শকে মর্যাদা দেবে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “সব চাইতে বেশী ভাল ব্যবহার হলো, যে ব্যক্তি তার পিতার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ভাল আচরণ করবে”।

“একবার হযরত আবু দরদা (রাঃ) অসুখে পড়লেন এবং অসুখ বাড়তেই থাকলো। এমনকি তার বাঁচারও কোন আশা রইল না, তখন হযরত ইউসাফ বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) অনেক দূর থেকে সফর করে তাকে দেখতে এলেন, হযরত আবু দরদা (রাঃ) তাকে দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? হযরত ইউসুফ বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) জবাবে বললেন, “আমি এখানে শুধু আপনাকে দেখতেই এসেছি। কেননা আপনার সঙ্গে আমার পিতার বন্ধুত্বপূর্ণ গভীর সম্পর্ক ছিল”।

হযরত আবু দারদাহ (রাঃ) বলেন, আমি মদীনায় আসার পর হযরত আবদুল্লাহ বি ওমর (রাঃ) আমার নিকট এসে বলতে লাগলেন, আবু দারদাহ, তুমি কি জান আমি কেন তোমার নিকট এসেছি? আমি বললাম, আমি কি করে জানবো যে আপনি কেন এসছেন? তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বললেন, রাসূল (সাঃ)-কে বরতে শুনেছি যে, “যে ব্যক্তি কবরে তার পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে চায় সে যেনো তার পিতার বন্ধু-বান্ধবদের সাথেও সদ্ব্যবহার করে”। তারপর বললেন, ভাই! আমার পিতা হযরত ওমর (রাঃ) ও আপনার পিতার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। আমি চাই যে, ঐ বন্ধুত্ব অটুট থাকুক এবং আমি তার হক আদায় করি”।

(ইবনে হাব্বান)

(iv) মাতা-পিতার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সর্বদা ভাল আচরণ করবে এবং তাদের নিকটাত্মীয়দের প্রতিও অসদাচরণ করবে না। ঐ সকল আত্মীয়দের থেকে অমনোযোগী হওয়া মূলতঃ মাতা-পিতা থেকে অমনোযোগী হওয়ার তুল্য। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, বাপ-দাদা ও মাতা-পিতা থেকে অমনোযোগী হওয়া আল্লাহর অকৃতজ্ঞতার শামিল”।

১৫.আল্লাহ না করুন! মাতা-পিতার জীবিতাবস্থায় যদি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের প্রতি হক আদায়ের ত্রুটি হয়েও থাকে তবুও আল্লাহর নিকট সদা সর্বদা তাদের জন্যে মাগফিরাতের দোআ করবে। আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তোমার ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে তার নেক বান্দাহদের মধ্যে শামির করে নেবেন।

হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহর কোন বান্দাহ যদি মাতা-পিতার জীবিতাবস্থায় তাদের প্রতি অসদ্ব্যবহার করে থাকে, এবং এমতাবস্থায় মাতা-পিতার কোন একজনের অথবা্ উভয়ের মৃত্যুবরণ হয়ে থাকে তাহলে এখন তার উচিৎ যে, সে যেন আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে মাগফিরাত কামনা করতে থাকে, যেনো আল্লাহ তাকে তাঁর রহমতের দ্বারা তাঁর নেক বান্দাহদের অন্তর্ভূক্ত করে নেন। http://www.tb-credit.ru/zaimy-na-kartu.html

Hits: 0

Comments
Loading...