মা তোমাকে বলছি…..

0 ৪২

মায়েদের বিপক্ষে কিছু বলা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ । মা শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে আমার মনে পড়ে যায় কবির সেই অনুপম ছন্দ শৈলী …..
“মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রি ভুবনে নাই”
সত্যি “মা”এর চেয়ে মধুর কোন ডাক এই পৃথিবীতে আজো সৃষ্টি হয়নি আর ভবিষ্যতে ও কখনো হবেনা । তাই “মা” শব্দটি শোনার সাথে সাথে যেন আমাদের হৃদয় তন্ত্রীতে মায়াময় একটা সুর বেজে উঠে ।যার রেশ কখনোই ফুরাতে চায়না…..।

কিন্তু, সে মা’দের নিয়ে ই আমার আজকের লিখা….আমার আজকের লেখাটি কিছু কিছু ছেলের মাকে উদ্দেশ্য করে লিখা । যেহেতু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অনুযায়ী মায়েরা সাধারণত শেষ বয়সে ছেলে এবং ছেলের বৌ এর কাছেই থাকে । আর এই বিষয় টি বেশির ভাগ মায়েদের চিন্তার কারণ । কিছু কিছু মা এই বিষয় টি নিয়ে খুব আতঙ্কিত থাকেন ….”আল্লাহ ই জানেন আপা ছেলের বৌ যে কেমন হয়? আমার একটা মাত্র ছেলে ….. বিয়ে দিতেই ভয় পাচ্ছি ।”

আবার কিছু মায়েরা আছেন যারা আগেই ছেলেকে বলে রাখেন “বাবা….ভার্সিটিতে পড়তে গেছিস ভাল কথা…..কিন্তু ঐসব মেয়েদের থেকে দূরে থাকিস …এরা ভাল হয়না …অত শিক্ষিত বৌ আমার দরকার নেই …আমি তোর জন্য ঐ যে আমাদের গাঁয়ের রহিম ব্যাপারী আছেনা ওর একমাত্র মেয়ে ( নাইনে পড়ে,এস.এস.সি পাশ করতে পারবে কিনা ঠিক নেই ) ঝুমি ওকে ঠিক করে রেখেছি…ভারী সংসারি মেয়ে…ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশংসার বন্যা ছুটে যায় ।

মা বুঝতেই পারেননা যে উনার আদরের ঝুমির জন্য ছেলের মনে বিন্দু পরিমাণ জায়গা নেই । হয়তোবা ছেলে চায় ওর বৌ ওর মতোই শিক্ষিত হবে কারণ শিক্ষিত হলেই যে সে খারাপ দেমাগী বা অহংকারী হবে তার তো কোন কথা নেই বরং শিক্ষিত মেয়েরাই বেশির ভাগ সময় অশিক্ষিত মেয়েদের চেয়ে নিরহংকারী ও ভালো হয়ে থাকে । সবাইকে বুঝে চলতে জানে।

ছেলেরা সাধারণত তার নিজের মন-মানসিকতা ও চিন্তা -ভাবনার সাথে মিলে এরকম কোন মেয়েকেই জীবন সঙ্গী হিসেবে প্রত্যাশা করে । দেখা যায় সেগুলোর কিছুই ঝুমির মধ্যে বিদ্যমান নেই ।এমতাবস্থায় কোন ছেলে যদি মায়ের পছন্দ মতো মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি না হয় তাহলে ছেলেটিকে কতটুকু দোষারোপ করা যায় ???

আবার অনেককে দেখা যায় কোন একটি নির্দিষ্ট আদর্শের লালন করছে সেক্ষেত্রেও কোন ছেলে একই আদর্শের লালনকারী কোন মেয়েকে বিয়ে করতে চাইতে পারে । আর মনোজাগতিক দিক দিয়েও একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে মন মানসিকতা , চিন্তা – ভাবনা ,রুচি ,পছন্দ -অপছন্দ ,ইত্যাদি বিভিন্ন দিক থেকে যত বেশি উভয়ের কাছাকাছি হবে তাদের সংসার ততবেশি সুখী হতে বাধ্য ।

কিন্তু, কিছু কিছু ছেলের মায়েরা এসব ক্ষেত্রে ভুল করে থাকেন । উনারা নিজের পছেন্দর মেয়েকে বিয়ে করার জন্য ছেলেদের শুধু প্ররোচিত নয় কখনো কখনো বাধ্য ও করে থাকেন । ছেলেরা তুলনামূলক মায়ের প্রতি বেশি দুর্বল হয়ে থাকে ,মাকে বেশি ভালবাসে ,আর মায়েরা সে ভালবাসার সুযোগ নিয়ে ছেলেকে জিম্মি করে থাকেন । এইসব মায়েরা বিভিন্ন কারণে এমনটি করে থাকেন…যেমন :

ক. বয়সে ছোট বা কম শিক্ষিত বৌ না নিয়ে আসলে বৌ কে অনুগত রাখা যাবে না।
অথচ এটা একটা ভুল ধারণা । শিক্ষিত ভালো মেয়েরা বিবেকবোধ সম্পন্ন ওরাও শ্বাশুড়ির যে কথাটি ন্যায় সংগত সেটা অবশ্যই মেনে চলবে আর অন্যায় হলে সেটা বুঝিয়ে বলবে । পৃথিবীর উন্নয়নের সাথে সাথে কুসংস্কার ,ভুলধারণা ইত্যাদি সবকিছু থেকে বের হয়ে আসা তো এখন সময়ের দাবি । কিন্তু এই মায়েরা যদি এখনো নিজেদের সময়ের সবকিছুকে সঠিক বলে আঁকড়ে ধরে থাকেন এবং তার সকল শিক্ষা দিয়ে আরেকজন উনার ডামি তৈরি করতে চান তাহলে সেটা কি আদৌ সম্ভব???

খ. আরেকটি ভয় মায়েদের মনে কাজ করে সেটা হলো ছেলে যদি তার পছন্দ মতো মেয়ে বিয়ে করে তাহলে ছেলে বৌ কে নিয়ে বেশি ব্যাস্ত হয়ে পড়বে , মাকে সময় দিবেনা , মাকে আর আগের মতো ভালবাসবে না। অর্থাত্ ভালবাসা হারানোর ভয় । এক্ষেত্রে মায়েরা নিজের চেয়ে কম যোগ্যতার মেয়েকে ছেলের বৌ করতে চান এবং ছেলের কাছে আজীবন নিজের আসন ধরে রাখতে চান । এই কাজটি অনেকটা অপরাধের মধ্যে ই পড়ে যায় ।
অথচ উনাদের ভাবা উচিত এর উল্টো টা ঘটারই সম্ভাবনা বেশি । কারণ একটি ছেলে যখন দেখবে যে তার মা তাকে ভালো রাখার জন্য কতটা Sacrifice করছে ..তখন সেই ছেলেটির মায়ের প্রতি ভালবাসার টান বাড়বে বৈ কমবে না ।
গ. মা ছেলের পছন্দে আরেকটি কমন কারণে বাঁধা দিতে পারে সেটা হলো :ছেলের পছন্দের criteria গুলো ভুল । এখানে ছেলে ভুল করলে অবশ্যই তাকে সঠিক পছেন্দর কথা বলা যায় । তবে এক্ষেত্রে ও দেখতে হবে মা এবং ছেলের মধ্যে কার ভালোর ধারণা কতটুকু সঠিক ?? এক্ষেত্রে ধর্মীয় দিক সহ অন্যান্য আচার -ব্যবহার ,স্বভাব -চরিত্র কে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে ।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ছেলেরা মায়ের পছন্দ কে প্রাধান্য দিয়ে বিয়ে করে ঠিকই কিন্তু সংসার লাইফে যেয়ে দুইজনের অমিল ,মনোমালিন্য লেগেই থাকে । অনেক সময় ছেলে মেয়েটিকে পদে পদে কষ্ট দিয়ে মায়ের উপর প্রচ্ছন্ন রাগ ঝাড়ে । মেয়েটির জীবন হয় দোজখের জীবন ।
একদিন এক ভাবীর সাথে গল্প করছিলাম । উনার হাজবেন্ড এক প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজার ।ভাবী শিক্ষিতা, আধুনিকা ,শালীন ,রুচিশীল ,ধার্মিক । গল্পে গল্পে জানতে চাইলাম : ভাবী আপনার শাশুড়ি কি বেঁচে আছেন ? উনি মুখ কালো করে বললেন : না নেই । আমাদের বিয়ের দিনে বরযাত্রী বের হওয়ার পর পরই আমার শাশুড়ি ষ্ট্রোক করে মারা যান । কি হৃদয় বিদারক ঘটনা !!!

আরেকজন মায়ের কথা জানি যার একমাত্র ছেলে মায়ের পছেন্দর মেয়ে না পেয়ে চল্লিশের কোঠা পাড়ি দিচ্ছে ।

আরেকজন মা যিনি ছেলে বিয়ের কথা বললে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অসুস্থ হয়ে পড়েন ।

আমি এইসকল মা দেরকে অত্যন্ত বিনীত ভাবে বলতে চাই -একটা শিক্ষিতা ভালো বংশের কোন মেয়ে যদি আপনার পরিবারে আসে তাহলে আপনার পরিবারের মুখই উজ্জ্বল হবে অন্য কারো নয় ।আপনার শিক্ষিত ভদ্র ছেলে যদি আরেকজন শিক্ষিতা ,শালীন মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসে তাহলে পারতপক্ষে আপনার পরিবারেই শিক্ষিতের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে । আর তাদের দ্বারা যে পরিবার গড়ে উঠবে সেটাও নি:সন্দেহে ভালোই হবে । সুতরাং ,মায়েরা আপনারা আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান । ছেলের পছন্দের সাথে সাথে নিজের পছন্দের ও উন্নয়ন ঘটান, আল্লাহ চানতো , জীবনের জটিলতা অনেকাংশে কমে আসবে । সবশেষে ভালো থাকুক মায়েরা,তার ছেলেরা আর ভালো থাকুক ছেলের বৌয়েরা যারা কোন বাড়ির আদরের মেয়ে…..।

Hits: 0

Comments
Loading...