বিয়ে বিড়ম্বনা

0 ২৮

রোকেয়ার কথাতে রফিক চাচা চমকে উঠল। ঠিকই তো রোকেয়ার কথামালা। সে তো কখনো এমন ভাবে বিষয়টি চিন্তা করে নি। অন্য কেউ তো তাকে এভাবে প্রশ্নও করে নি। কোনো কথা কোরান-হাদীসের নামে শোনার পরে আবার প্রশ্ন করতে হয়- এমনটাও তিনি নিজে কখনো ভাবেন নি। ছোট বেলা থেকেই রফিক সাহেবের লেখা-পড়াই ভালই নাম-ডাক ছিল। হালের বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ কিংবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মত নামি দামি প্রতিষ্ঠান না থাকলেও তখন তিনি যেখানে পড়াশুনা করেছেন সেটিও তো কম না। কিন্তু রফিক সাহেব কখনো কোন শিক্ষক কে প্রশ্ন করার সাহস করেননি ।

 

তাছাড়া রফিক সাহেবের নিজের মেয়ে রওশন আরাও তো ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ে। সেও তো এভাবে বিষয়টি সামনে আনেনি।

 

রওশন আরা আর রোকেয়া কাজিন। বয়সে প্রায় সমান। একই বছরে তারা দুজনে গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে এসেছে উচ্চ শিক্ষার্থে। রওশন আরা ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগে আর রোকেয়া ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। দুজনেই ছোট্ট বেলা থেকেই লেখা-পড়াই বেশ মনোযোগি। একই পরিবার থেকে তারা দুজনেই তাই যেন আকাশের চাঁদ। গ্রাম ভর্তি মানুষের কাছে তাদের সুনাম। দরিদ্র পরিবার থেকে উচ্চ-শিক্ষা গ্রহণ করে তারা নিজের, পরিবারের ও দেশের সুনাম বয়ে আনবে- এই সকলের কামনা।

 

রোকেয়া আর রওশন আরার মধ্যে গলায়-গলায় ভাব। সব কাজে দু জনের এক সাথে থাকা চায়। গ্রামের যে কোন মহিলা, বৃদ্ধা এমন কি শিশু-কিশোরী ছাত্রীদের প্রয়োজনে তারা দু বোন গিয়ে হাজির হয়। তাই তারা সকল মানুষের অতি প্রিয়। শুধু কি তাই- স্কুল, কলেজ কিংবা গ্রামের যে কোন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে তারা সবার আগে। অনুষ্ঠান আয়োজন হতে পার্টিসিপেশন, শুরু থেকে সমাপ্তি সকল ক্ষেত্রেই তাদের সরব উপস্থিতি। ফলে স্কুল-কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে সকল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, উপজেলা ও জেলার ইউএনও কিংবা ডিসি মহোদয় সবার কাছেই তাদের বায়না কবুল। কোন দাবি বলতে দেরী কিন্তু তা পেতে কোন দেরী হয় না তাদের।

 

ঢাকার  উচ্চ শিক্ষায়তনেও তাদের কোন ছন্দ পতন ঘটেনি। এখানে এসেও তাদের পড়াশুনার কোন কমতি লক্ষ্য করা যায় নি। দুজনেই আপন আপন জায়গায় অসাধারণ রেজাল্ট করে যাচ্ছে। স্বভাবতই তাদের জীবনে কোন দুঃখ নেই। জীবনে যখন এত প্রাপ্তি, এত ভালাবাসা, এত অর্জন, তখন চিন্তারই বা কি আছে? তাদের পারিবারিক দারিদ্র কিংবা গায়ের শ্যাম বর্ণ তো কখনো যোগ্যতা বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। কেউ তো এসব বিষয় সামনে এনে কখনো তাদের ছোট চোখে দেখেনি। একই ক্লাসে তো ধনী ধনী চেয়ারম্যান-মেম্বার কিংবা ইউএনও-ডিসির মেয়েরা পড়লো। কিন্তু তারাই তো সর্বদাই আপন আপন ক্লাসে সবাই কে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান আগলে রাখলো।

 

এই প্রথম রোকেয়া জীবনে হোঁচট খেলো। সে তো প্রথমে বিয়েতে রাজীই হয় নি। রওশন আরার সাথে কথা ছিল- দুজন এক সাথে পড়া শেষ করে তারপর বিয়ের কথা ভাববে। কিন্তু এক পাত্র পক্ষের অতি উৎসাহের কারণে এবং কৃষক পিতার করূণ চাহনিকে উপেক্ষা করতে না পেরে রোকেয়া এক রকম নিজের অমতেই বিয়েতে রাজি হয়। কদিন পরেই মাস্টার্সের পরীক্ষা শুরু হবে। তবুও আব্বু-আম্মুর কথা ফেলতে না পেরে রোকেয়া গ্রামে এসে হাজির হয় বিয়ের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিধি বাম। এ কি হলো! সে এসব কি শুনছে? নিজের কান কে যেন সে বিশ্বাস করতে পারছেনা। যা সে জীবনে ভাবে নি, যা কখনো শোনে নি তাই আজ শুনতে হলো। তবূও এমন বিপর্যস্তভাবে। বর এবং বরের মা-মেয়ে নাকি তাকে দেখে পছন্দ করে নি। সে নাকি দেখতে কালো। বর পক্ষের একটাই কথা- ছেলের বিয়ে তো আর বার বার দেয়া যায় না- বিয়ে জীবনে এক বারই হয়। তাছাড়া বিয়ের ক্ষেত্রে নাকি কালোর কোন ডিম্যান্ড নেই- এখানে সাদাদের প্রাধান্য। রোকেয়ার এক কথার জবাবে বর তো বলেই ফেললো- শুনেন, আপনার যত গূণই থাকুক না কেন- বিয়ের বাজারে এসব মূল্যহীন।

 

এ কথা শুনে রোকেয়ার মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে স্তম্ভিত হয়ে কোন কথা না বাড়িয়ে সালাম দিয়ে সকলের সামনে থেকে বিদায় নিল। কারো সাথে কোন কথা না বলে সে সোজা গেলো তার চাচা রফিক সাহেবের নিকট। গিয়ে বলল- চাচা, আপনি না বরের ব্যাপারে অনেক বড় বড় কথা বললেন। অনেক শিক্ষিত। খুব উদার মনের। বেশ বনেদী ঘরের। কিন্তু তার কোন পরিচয় তো  দেখলাম না, চাচা। চাচা, এ আপনারা কোন জেনারেশন, কোন সমাজ তৈরী করছেন। যেখানে মানুষের গুণ দিয়ে মানুষ কে বিবেচনা না করে তাকে বিবেচনা করা তার চামড়ার বর্ণ দিয়ে। ব্যক্তির বিকশিত মেধার গুরুত্ব না দিয়ে বরং বংশ-গৌরব, কৌলিন্যপনাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। পৃথিবীর সকল কাজে যে যোগ্যতা কাজে লাগে সে যোগ্যতাকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র বিয়ের পুর্বে নারীর গায়ের মেলানিন নামক এক পদার্থের অণু-পরমাণু কে এত প্রাধান্য দেয়া হয়।

 

জন্মের পর মায়ের ভালবাসা পাবার জন্য কিংবা মা হিসাবে সন্তান কে ভালবাসার জন্য, সমাজ- পরিচালনা কিংবা সমাজ সেবার ক্ষেত্রে, পড়াশুনা কিংবা চাকুরী-বাকুরীর ক্ষেত্রে, আদর্শ সন্তান কিংবা আদর্শ মা হতে, আদর্শ বোন কিংবা ফুফু-খালা-কিংবা নানু-দাদু হতে তো গায়ে মেলানিনের পরিমাণ কোন ভূমিকা রাখেনা। সন্তান ধারণ কিংবা সন্তান লালন-পালন, স্বামী-ভক্তি কিংবা স্বামী সহকারী হতেও এসব গা-বর্ণ কোন রোল প্লে করে না। তাহলে কেন- কেন শুধুমাত্র বিবাহপূর্ব এই এতটুকু সময়ে গা-বর্ণের এই মূল্যায়ন। জাস্ট বিয়ে হয়ে গেলেই যা মুল্যহীন, তাই বিয়ে পূর্বে কেন এত দূর্মূল্য।

 

চাচা, আপনিই বলুন, চাচীর গায়ের রঙ আপনার সংসার জীবনে যদি কোন বাধা হয়ে না থাকে, আমাদের গায়ের রঙ যদি আপনার আমাদের ভালবাসার ক্ষেত্রে কোন দেয়াল তৈরী না করে তাহলে কেন আপনারা “বিয়ে” নামক বিষয়টিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করে রেখেছেন।

 

কেন আপনারা ইস্লামে দিক্ষিত হয়েও ইস্লামের এমন একটি মৌলিক শিক্ষাকে অবমূল্যায়িত রেখেছেন। তাকওয়া অর্জনের জন্য যে সব গুণাবলী অপরিহার্য সেগুলো কে এ্যাভয়িড করে কেন প্রায় নিস্প্রয়োজনীয় গূণটিকে সামনে এনে এমন ডিস্ক্রিমিনেশন সৃষ্টিতে সহযোগিতা করছেন। কেন আপনারা এ গুণটিকে গুরুত্ব দিয়ে শয়তানের কার্যাবলী বিকাশে কোন সুগভীর চিন্তা ছাড়াই সাহায্যের হাত উম্মুক্ত রাখছেন।

 

ছোট ভাস্তি রোকেয়ার এসব প্রশ্নের সামনে রফিক চাচা আজ যেন অবোধ শিশূর ন্যায় অসহায় হয়ে পড়লেন। তিনি আজ লা জওয়াব। তিনি শুধু দুচোখ আদিগন্ত বিস্তৃত রেখে ভাবছেন- ভুল টি কোথায়? ভুলের সন্ধানেই রফিক চাচা অসীম চিন্তা রাজ্যে সন্তরণশীল।

Hits: 1

Comments
Loading...