Hits: 5

অভিশাপ সহস্র অভিশাপ।গোখরা হয়ে ছোবল মারুক বিত্তবানদের মস্তক বরাবর……………শ্রমিক ভাইয়া-অাপুরা আমাদের ক্ষমা করে দিস।

0

সেই ভয়াল অভিজ্ঞতা আজও কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। মৃত্যুকূপের Nokia ১২০০ মডেলের সেই মোবাইলের রিংটোনটা আজও কানে বেজে উঠলে অন্তরটা বেদনার্থ স্পন্দনে কেঁপে উঠে। স্বচোখে দেখা রানা প্লাজার সহস্রাধিক শ্রমিকের গগনবিধারী কান্না প্রতিনিয়ত আমাকে পিঁড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে। ভয়ংকর ধ্বংস লীলার বিভৎস লাশগুলোর অদৃশ্য অভিমানগুলো প্রতিটা মুহুর্তে বিবেকে নাড়া দিচ্ছে। নিজ হস্তে লেগে থাকা নিরীহ শ্রমিকের রক্তের দাগ শত চেষ্টা করেও আজও মুছতে পারছি না। অভিশাপ-সহস্র অভিশাপ। মা-বাবা হারা নিষ্পাপ অবুঝ শিশুর আর সন্তান হারা পিতামাতার নীরব অভিশাপ। যা বিঁষধর গোখরা হয়ে ছোবল মারবে বিত্তবানদের ব্যাংক-ব্যালেন্সে। আঘাত হানবে রথি-মহারথিদের মস্তক বরাবর। স্ফুলিঙ্গ হয়ে ভাসিয়ে নেবে অজানা সুনামির স্রোতে। প্রতিদিনের মতো চিরসবুজ উদ্ভিদে বসে থাকা পাখপাখালির কিচির-মিচির আর কুহুকুহু সুমধুর সুরেলা পরিবেশে ক্যাম্পাসে ক্লাস করছি। হঠাৎ চারদিকে পিনপন নিরবতার ছোঁয়া সবকিছু উলটপালট হয়ে যাচ্ছে। পাখিগুলো কেন জানি আগের মতো মনমাতানো গান গাইছে না, মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো কেন জানি গুটিয়ে যাচ্ছে, দৃষ্টিনন্দর লেকগুলো তরঙ্গের মতো আর দুলছে না। প্রকৃতির সতেজ হাওয়াকে থামিয়ে বাতাসে কান্নার সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। আচমকা শুনতে পেলাম সাভারের রানা প্লাজা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। বিল্ডিংয়ে পিষ্ট হয়ে আছে হাজার হাজার পোশাকশ্রমিকের নিরপরাধ প্রাণ। উৎসুক সবার মতো আমিও ছুটলাম ইতিহাসের নির্মম ট্র্যাজেডির দিকে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এক নজর দেখার স্পৃহায়! দীর্ঘ অবিরাম চেষ্টার পর জনসুমদ্রের ভিড় ঢেঙ্গিয়ে পৌছলাম মর্মান্তিক সেই মানুষ খেকো ভবনে। আঁতকে উঠলাম। চারদিকে লাশের স্তূপ। কিছুটা ভয় লাগলেও মানবতা আর বিবেকবোধ নিয়ন্ত্রনের বাইরে। মুখে একটা সাদা কাপড় এবং এক হাতে স্প্রে অন্যহাতে একটি টর্চ নিয়ে ঢুকে পড়লাম মৃত্যুকুপে। ছোট্ট ঘুটঘুটে অন্ধকার সুড়ঙ্গ বেয়ে তন্যতন্য করে খুজছি। কোথায় কোনো জীবিত প্রাণের আওয়াজ শোনা যায় কি না। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে আমার। মুখ স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কষ্টের পানিতে দুচোখ টলমল করছে। সম্পদশালীরা কি এতটাই নরাদম! কারো হাত, কারো দুই পা, কারো কোমরটা কংক্রিটের নিচে আটকে আছে। কারো পেটের মধ্যে পেরেক ঢুকে নিথর দেহটা ঝুলছে। কারো অর্ধেক দেহটা উল্টো হয়ে ইটের নিচে আর পা দুখানা আকাশের দিকে। কংকিটের আঘাতে কারো মাথাটা থেতলে গেছে। জন্মই যেন তাদের অজন্মা পাপ! হঠাৎ অন্ধকার থেকে কন্ঠ আসলো, ও ভাই, ও ভাই আমারে বাঁচান। আমারে বাঁচান। না হলে আমাকে একটি কাঁচি দেন। আমার পা দুটো কেটে ফেলুন। পাশেই এক মহিলার পিলারে চাপা পড়া লাশটা উঠাতে গিয়ে দেখি হাত শরীরে রাখা মাত্রই মাংস খসে পড়ছে। আরেক মহিলার করুণ আর্তনাদ, ও ভাই আমার পেটে বাচ্চা। আমার ময়টারে বাঁচান। ও আল্লাহগো আমার মাইরা ফেল তবু আমার বাচ্চাটারে বাঁচাও। এতক্ষণ ঠিক ছিলাম কিন্তু মহিলার বুকফাটা কান্না দেখে নিজের চোখ দুটোকে ধরে রাখতে পারলাম না। বিধাতার অপার মহিমায় সেইদিন ভয় শব্দটা শ্রমিকের চোখের জল আর তাজা রক্তের সাথে মিশে দিয়েছিলাম। যতক্ষণ পেরেছি একটু নিস্তার দেইনি। আদম সন্তানদের পাশে থেকেছি। সারা দেশ কেঁদেছে, কাঁদে নরকের জানোয়ার লোভী মালিকরা। নিলর্জ্জের মতো কুকুরীপণা চালিয়ে যাচ্ছে । রক্তচোষা শুকুনের মতো এখনো তারা শ্রমিকের রক্ত চোষে খাচ্ছে। পরিবর্তন আনতে পারেনি গণতন্তের পটকাবাজরা! সাহায্যের বহর নিয়ে এগিয়ে আসেনি শহুরে স্মার্ট শিক্ষিত যুবকরা। কিন্তু সেই দিন উদার হস্তে মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল গরীব-অর্ধশিক্ষিত, আনস্মার্ট মাদ্রাসার ছাত্ররা। কেন জানি সমাজ থেকে মানবতা নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে! অহংকার স্থায়ীভাবে দানা বাঁধতেছে….আমি ভুলতে চাই কিন্তু পারিনি। আজও সাভারে গেলে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকি…..দেখি মানুষ কতটা পশু হতে পারে……….

Hits: 5

Comments
Loading...