Hits: 0

ভিজিল্যান্টিজম

0

গোথাম সিটিতে যখন আইনশৃংখলার সীমাহীন অবনতি হয়, দুর্নীতিবাজ পুলিশ আর ব্যর্থ প্রশাসন যখন আর সামলাতে পারেনা, তখন মানুষের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে সুপারহিরো বাদুরমানব।ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান।

এর নাম ভিজিল্যান্টিজম।

পর্দায় কিংবা পৃষ্ঠায় এই ভিজিল্যান্টিজমকে খুব সাহসী এবং উচিত কিছু মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভিজিল্যান্টিজম একটা সমাজের চরম বিপর্যয়ের প্রকাশ, ব্যার্থতার প্রতীক। ভিজিল্যান্ট জাস্টিস সবসময় শেষপর্যন্ত দানব অথবা অবিচার হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর কোন ব্যাতিক্রম নেই। রিটায়ার্ড সিআইএ এজেন্ট লিয়াম নেসনের প্রতিশোধ নেয়া এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা পর্দায় দেখতে আনন্দদায়ক। কিন্তু বাস্তব জীবনে তা বিশাল এক সমস্যা। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার এ মধুর দৃশ্য আসলে ততটা মধু না, বরং অনেক তিতা।

বাংলাদেশের মেয়েরা এগিয়ে আসছে, সমস্যায় পরে যাওয়ার পর তারা সম্ভ্রম বাঁচাতে প্রতিবাদী হয়ে উঠছে। নিজেদের শুন্য মস্তিস্ককে এতো গর্ব করে প্রদর্শন করার জন্য, একেকজন সুপারউওম্যান বাদুরমানবী হয়ে উঠার জন্য তাদের অভিনন্দন জানাই।

কচু হবে। ডেডিকেশনের সাথে মার্শাল আর্ট শেখা আর ফেইসবুক ভিডিওতে স্টান্টবাজির মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ। তাছাড়া, সুশাসন না থাকলে একেকজন ব্রুসলি হয়ে গেলে লাভ নেই, বখাটেরা আপনাদের নিয়ে ঠিকই কুকুরের মত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালিয়ে যাবে গ্যারান্টি দিলাম। আসল সমস্যা কোথায় তা চিহ্নিত করতে পারলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করুন, আর না পারলে মুড়ি খান।

যেইসব মেয়েরা ছুরি কাঁচি নিয়ে বের হওয়ার ভিডিও বার্তা দিচ্ছে, তাদের জন্য আমি করুণা অনুভব করি। বেচারীর দল। এমন এক সমাজের বাসিন্দা এরা যেখানে রাষ্ট্র তার নাগরিকের ন্যুনতম নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ।

যেইসব পেইজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বখাটেদের ছবি আইডেন্টিফাই করে দিচ্ছে, তাদের জন্য আমি করুণা অনুভব করি। এমন এক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে এরা, যে সমাজে এ কাজ করার দায়িত্ব ছিলো পুলিশ আর মিডিয়ার। কিন্তু পুলিশ ব্যস্ত ঘটনাকে মুছে ফেলতে, মিডিয়া ব্যস্ত খাঁজকাটা খাঁজকাটা চিৎকার করে দাড়িওয়ালা আনসারুল্লাহ বাংলাটিমকে ধরতে।

যেইসব অনলাইন একটিভিস্টরা ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে ভবিষ্যতে ভিজিল্যান্টিজমের মাধ্যমে বখাটেপনা প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা করে তাদের জন্য আমি করুণা অনুভব করি। চারপেয়ে কিউট উল্লুকের দল। যে কাজ করার কথা পুলিশের, সেই পুলিশ নামের রাজনৈতিক রক্ষীবাহিনীর হাতে ফুল তুলে দিয়ে এরা নিজেরা ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় নামার চিন্তা করে। বলিহারি বুদ্ধির বাহার।

যেইসব বুদ্ধিজীবি সাংবাদিক জাতির বিবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চায়, তাদের জন্য আমি করুণা অনুভব করি। এইদেশে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে শুরু করে ড্রেনের ভাঙ্গা স্ল্যাব কিংবা কেটে যাওয়া ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের তার সারানো সব সমস্যার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়, সব কিছুর সমাধানকে এক ব্যাক্তির ইচ্ছা আর ক্ষমতার ছাতার তলে কুক্ষিগত করার এমন উদাহরণ সম্ভবত হিটলারও তৈরী করতে পারেনাই। তবুও তার কাছে ভিক্ষা চাইতে থাকা দেখে সেই দেশের মানুষদের বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তার মান নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। এরা দাস। এরা দাসানুদাস হয়ে থাকতেই ভালোবাসে। অমুকের ছেলে কিংবা তমুকের বউ শুনলে এরা হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য হয়ে ভোট দেয়ার জন্য হামলে পড়ে।

এ ধরণের দাসমনোবৃত্তির বেকুব জাতির জন্য একাত্তর টিভিই আসলে উপযুক্ত মিডিয়া। এক দাড়িঅলা ছেলেকে দেখিয়ে দেখিয়ে আর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ফেইসবুক বার্তার কথা শুনিয়ে আমাদের সাংবাদিকরা প্রমাণ করে দিয়েছে, পয়লা বৈশাখে কুকুরদের হাড্ডি টানাটানির মতো করে মেয়েদের নিয়ে কামড়াকামড়ি করার ঘটনাগুলো ছিলো ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের কাজ।

বাংলাদেশে মাদ্রাসাপড়ুয়া দাড়িওয়ালা টুপিপরা ছেলেগুলো মেয়েদের উত্যক্ত করে। আর গাঞ্জাখাওয়া নাস্তিক প্রগতিশীল শাহবাগিরা সাধারণত মেয়েদের ইজ্জত সম্মান বাঁচাতে মান্না-রুবেল হয়ে আবির্ভূত হয়। ঠিকইতো! আমরা জানতাম। এখন টিভি-নিউজের বিশ্লেষণ দেখে ইয়াক্বীনের সাথে ঈমানও আনলাম। আপনি কি সিসিটিভিতে ঐ দাড়িওয়ালা একটা ছেলের ঘুরঘুর করার আর দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যকে অস্বীকার করতে পারবেন? হু। যে দেশে অপরাধীর শাস্তির চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা আদায় মুখ্য হয়ে দাড়ায়, যে জাতির মানুষরা নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করে অথবা নিজের মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে হলেও কল্পিত মৌলবাদের প্রতিরোধ করে সুখী হয়ে যায়, তাদেরকে শুধু শুকনো অভিনন্দন না বরং দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন দেয়া দরকার।

যাইহোক, আরেকটা শ্রেণীকেও এ সুযোগে নগন্য বাংলাদেশী হিসেবে অভিনন্দন জানাতে ইচ্ছুক। তারা হচ্ছেন ঈমানদার ভাইয়েরা।

আমি জানি, যদি আমাকে ছিনতাইকারীর দল ছুরি মারে তখন এরা এসে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা, নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়া রক্তাক্ত আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান শুরু করবে, ছিনতাই হয়ে যাওয়া ঐ টাকাগুলো কি সুদী ব্যাংকের লেনদেন করা? আচ্ছা, ওগুলো কি হালাল পথে না হারাম পথে উপার্জিত টাকা? হুমম। ঐ টাকাগুলোর কি যাকাত দেয়া হতো? ছুরি খেয়ে কাতর আমার তখন কি ইচ্ছা করবে তা নাহয় নাই বললাম, আপনার ঈমান অনেক মজবুত আপনি ওদের এই ইসলামপরায়ণতা এপ্রিশিয়েট করেন তা আপনার ব্যাপার। আপনি মহান।

উচিত অনুচিতের বায়বীয় কথাবার্তার বাইরে এসে মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চশমা দিয়ে যতদিন দুনিয়া আর সমাজটাকে দেখতে শিখবে না, ততদিন এরা লাথিগুতা খেয়েই দিন কাটাবে। নির্বোধদের জন্য এটা নিয়তি-নির্ধারিত প্রাপ্য।

আর সাধারণ বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের প্রাপ্য হলো প্রগতিবাদী আর ঈমানবাদীদের মাঝখানে পড়ে ভাজা ভাজা হওয়া। বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে যেন অভিশপ্ত হয়েছি। আমার বোনটা অপমানিত লাঞ্চিত হয়ে বাসায় এসে কাঁদে। অক্ষম আমি কিছু করতে পারিনা। রাজনীতির সার্কাস দেখি। অভিনন্দনের মানপত্র লিখি।

-collected

Hits: 0

Comments
Loading...