Hits: 4

ভারতীয় মুসলমানদের সংকট ও সমস্যা

0

মাহমুদের দরবারেও ফিরদৌসীর মতো কবি ছিলেন, আল-বীরূনীর মতো পন্ডিত তার সহচর ছিলেন এবং তার রাজধানী গজনী ছিল সংস্কৃত ভাষা ও জ্ঞান চর্চারও একটি কেন্দ্র। তিনি স্বয়ং ছিলেন বহুভাষাবিদ, তার মুদ্রার একটি পিঠে দেখা যায় সংস্কৃত ভাষার স্বীকৃতি। উল্লেখযোগ্য যে দক্ষিণ ভারতের দুই ঐতিহাসিক নীলকান্ত শাস্ত্রী ও শ্রীনিবাসচারি কর্তৃক লিখিত Advanced History of India গ্রন্থে মাহমুদের ভিন্নতর বিচার দেখা যায়। তারা লিখেছেন, ‘His outlook on life was essentially secular in the spirit of the Persian Renaissance and he had a love of power and money. তাছাড়া মাহমুদ অথবা আল-বিরূনীই ভারতের মানুষকে ‘হিন্দু’ আর ভারতের প্রচলিত ধর্মকে ‘হিন্দু ধর্ম’ নাম দেন। এই অর্থে মাহমুদই হিন্দু ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা।

অথচ উত্তর এবং পূর্ব ভারতের বিদ্যালয়গুলিতে ইতিহাসের পুস্তক রূপে যেগুলি পড়ানো হয় সেগুলিতে মাহমুদ রাক্ষসতুল্য একজন যুদ্ধবাজ মূর্তিধ্বংসকারী বর্বর মানুষরূপে চিত্রিত। ফলে বিদ্যালয়ের স্তর থেকেই অমুসলিম ছাত্রছাত্রীর মনে মাহমুদ সম্বন্ধে ও মাহমুদের ধর্ম সম্বন্ধে এক তীব্র বিদ্বেষ জাগে এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের একাংশ গ্লানিবোধে আক্রান্ত হয়, তখন তারা কোণ-ঠাসা-মানসিকতা থেকে ভাবতে শুরু করে যে, এই ইসলাম-বিদ্বেষীদের ঠেঙিয়ে ও লুঠ করে মাহমুদ বেশ করেছিলেন। আর অপরাংশ পরিণত হয় হীনম্মন্যে। এইভাবে বিদ্যালয়ের স্তরে ইতিহাস পড়ার সময় থেকেই অর্ধসত্য বা অসত্য তথ্যাবলির প্রতিক্রিয়াতে শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে হিন্দু-মুসলিমের বিভেদ সৃষ্টি হয়। এই বিভেদের প্রভাব অনিবার্যভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে পড়ে শিক্ষার সুযোগ-বঞ্চিত বিপুল জনসমষ্টির উপরেও।

সাম্প্রদায়িক বিভেদ দ্যোতক ইতিহাসের ধাঁধাঁ আরও অনেক আছে। তার মধ্যে একটি হল প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ বলে গণ্য গুপ্তযুগের সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত সংক্রান্ত। উপরে বলেছি যে ভিনসেন্ট স্মিথ প্রশংসার অর্থে সমুদ্রগুপ্তকে ভারতের নেপোলিয়ন বলে অভিহিত করেছেন। আর মজুমদার-রায় চৌধুরি-দত্ত লিখেছেন যে সমুদ্রগুপ্ত বোধহয় গুপ্ত বংশের সবচেয়ে মহান রাজা। তার মহত্ত্বের কাহিনী যে এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে জানা যায় একথাও ওই ঐতিহাসিকত্রয় জানিয়েছেন।

কিন্তু একথা তারা জানাননি যে ওই শিলালিপি প্রকৃতপক্ষে অশোকেরই সেই বিখ্যাত শিলাস্তম্ভ যেখানে অশোক দেশবাসীকে শান্তি ও অহিংসার পথে জীবনযাপনের উপদেশ দিয়েছেন এবং সেই একই স্তম্ভগাত্রে যেন অশোকের উপদেশকে ব্যঙ্গ করে সমুদ্রগুপ্তের যুদ্ধ ও হিংসার প্রশস্তি খোদাই করা হযেছে। সমুদ্রগুপ্ত অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন কিন্তু তারা এটা জানাননি যে রাজ্য বিস্তারের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করা হত এবং তার দক্ষিণ ভারত অভিযানের কারন ছিল নিছক রাজ্যলিপ্সা ও ধনলিপ্সা। তারা এটাও জানাননি যে সমুদ্রগুপ্তের যতরকম মুদ্রা পাওয়া গেছে সেগুলির মধ্যে মাত্র একটি বাদে বাকি সবরকম মুদ্রাতেই সমুদ্রগুপ্ত অস্ত্রধারী ও হত্যাকারী রূপে চিত্রিত।

মনে হয় না কি যে যে-জাতীয় সামরিক ‘পরাক্রমে’র জন্য সমুদ্রগুপ্ত বন্দিত সেই জাতীয় ‘পরাক্রমে’র জন্যই মাহমুদ নিন্দিত? সমুদ্রগুপ্তের অভিযানের পরিণামে কি দক্ষিণ ভারতের অর্থনীতি ও সমাজ বিপর্যস্ত হয়নি? সমুদ্রগুপ্ত ও মাহমুদের ঐতিহাসিক মূল্য-নিরূপণ কি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈষম্যের সূচনা করে না?”

– সুরজিত দাস গুপ্ত / ভারতীয় মুসলমানদের সংকট ও সমস্যা ॥ [ ইতিহাস সংকলন, প্রণয়ন ও গবেষণা সংস্থা – জানুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ১১-১২ ]

Hits: 4

Comments
Loading...