গিবত কি শুধু মেয়েরাই করে?

0 ৫২

629_2gossip.jpg
আমার এক আত্মীয়- উনি যখনই বেড়াতে আসেন, তখনই বিভিন্নজনের নামে গিবত করা শুরু করে দেন। কে ক্যামন, কে কার ব্যাপারে কি বলেছে, এমনকি যে কথা মূলত গোপন রাখলেও পারষ্পারিক সম্পর্ক ঠিক থাকতো- তাও বলে বেড়ান। ফলে যা হবার তাই হয়! পারষ্পারিক মনোমালিন্য, রেশারেশি।

আরেকটা মজার ব্যাপার দেখলাম- আমরা সবসময় গিবতকারী হিসাবে মেয়েদের বুঝালেও ভাইয়ের মুখে শুনতাম- কিভাবে ছেলেরা ক্লাসের মেয়েদের পিঠ পিছে গিবত করে আর তেমনি বাস্তবেও দেখেছি- আমারই এক আন্টির কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি নিয়ে কিভাবে আমারই আরেক আত্মীয় (পুরুষ) গিবত করলো। সুতরাং, এক্ষেত্রে নারী-পুরুষে কোনো পার্থক্য নেই।

যেহেতু গিবত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাই এব্যাপারে একটু বলি- দোষ-গুণ নিয়েই মানুষ। আবার এমনও হয় একজনের কিছু আমাদের কাছে দোষের মতো লাগলেও আরেক জনের নজরে সেটা দোষ বলে মনে হয় না। সে যাই হোক- কথা হলো- কারো দোষকে তার আড়ালে অন্যের সামনে প্রকাশ করাটা গিবত (যেটা শুনলে সে কষ্ট পাবে)। এখন কথা হলো- যদি তার দোষটা বৃহত্তর অবস্থান তথা পুরো জাতির জন্য বিপদজ্জনক হয় তখন সেটা বলা যায়। সতর্কতার জন্য,সবার সচেতনতার জন্য। যেমন শাসকের দোষ- যা পুরো দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার আসি ব্যক্তি প্রসঙ্গে- কারো কিছু যদি দোষ বলে মনে হয়- তাহলে সম্ভব হলে তাকে একান্তে বলাটা উত্তম, সবার সামনে লজ্জা দিয়ে নয়। নিয়ত থাকবে তাকে ভালো করার। কারণ এক মুসলিম আরেক মুসলিমের আয়না স্বরূপ। সে আরেকজনকে সংশোধনের চেষ্টা করবে। আরেকটা বিষয় দেখুন- অনেক সময় কেউ আমাদের কে কষ্ট দিলে- সেটা কষ্টদাতাকে বলা যায় না, তখন কষ্ট লাঘবের জন্য আমরা অন্যের সামনে বলি। তবে এই বলার ক্ষেত্রে যে বিষয়টার ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে তাহলো- আমাকে যে কষ্ট দিয়েছে- তার নামে উল্টাপাল্টা কিংবা তাকে বদনাম করা নয়, বরং তার নাম উহ্য রেখে নিজের মনের অবস্থা তুলে ধরা, বস্তুত- ভুলটা কোন জায়গায় হয়েছে, কে করেছে- সেটা বুঝার জন্য।

লক্ষ্যণীয়- কেউ কেউ মনে করেন- গিবত ছাড়া নাকি আড্ডাই দেয়া যায় না। মূলত এগুলো হচ্ছে ভ্রান্ত ধারণা ও বদভ্যাস। আমরা এমন ধারণা পোষণ করি- কারণ আমরা কল্পনা করতে পারি না- যার ব্যাপারটা নিয়ে আমরা হাসাহাসি করছি- সে জানতে পারলে কি পরিমাণ কষ্ট পাবে, সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া তখন হয়ত কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার থাকবে। সুতরাং- গিবত দিয়েই যে আড্ডা দিতে হবে তা না। শুধু আমাদের মনোভাব সুন্দর করতে হবে, তাহলে আড্ডার বিষয়বস্তুও সুন্দর হবে।

গিবতের কিছু কমনক্ষেত্র- যার ব্যাপারে না বললেই নয়। আর এ বিষয়ে আমার এক ফ্রেন্ড কিছু মত দিয়েছে, বাকি আমি নিজেও কিছু মত দেই। তাহলো-

১/ শাশুড়ির গিবতঃ মায়ের বাসায় আসলে অধিকাংশ মেয়েরাই শাশুড়ির নামে গিবত করা শুরু করে। আর মা’রাও দোষটা কার এটা না দেখে অন্ধভাবে সব সময় মেয়েকে সমর্থন করেন- এটা ভুলে যান তিনিও কিন্তু একদিন শাশুড়ি হবেন…
২/ স্বামীর ব্যাপারে গিবত,
৩/ স্ত্রীর ব্যাপারে গিবত,
৪/ কাজের বুয়ার মখে পাশের বাড়ির ভাবীর গিবত শ্রবণ, (গিবত শোনা আর করা একই পাপ)
৫/ ভাইবোনদের সামনে মা-বাবার নামে গিবত-
সুতরাং, দেখা যায়- গিবত করতে গিয়ে আমরা কাউকে ছাড়ি না।

এদিকে আরেকটা মারাত্মক বিষয় হলো- মা-বাবার গিবতের প্রভাব ছোটবেলা থেকেই সন্তানের ওপর পড়ে। যখন খোদ মা বিভিন্ন মেহমানের সামনে মজার ছলে অনুপস্থিত আরেক আন্টির অভিনয় করে দেখানোর জন্য নিজের ছোট মেয়েকে বলে- “মা-মণি, একটু দেখাও তো! ঐ আন্টি জানি কেমন করে”? কি বুঝলেন? এই হলো মারাত্মক পরিস্থিতি! ছোটবেলা থেকে গিবতের ট্রেনিং!

আমাদের জানা থাকা ভালো যে- আমরা যার ব্যাপারে গিবত করি- সে যদি আমাদের ক্ষমা না করে তাহলে কিন্তু আল্লাহও ক্ষমা করবেন না। আর অবশ্যই আমরা কেউ নিজের ভাইয়ের মরা মাংস খেতে রাজি নই। তাছাড়া গিবত করাটা যে নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনা সে ব্যাপারে আল্লাহ সূরা হুমাজাহ’র ১ম আয়াতেই উল্লেখ করেছেন- “ নিশ্চিত ধ্বংস তাদের জন্য যারা অপরের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করে আর পরনিন্দা চর্চায় পঞ্চমুখ হয়।”

আর রাসূলুল্লাহ সাঃ আফসোস করেছেন সেই ব্যক্তির জন্য যে গিবতের কারণে কবরে আজাবের সম্মুখিন হয়েছে- অথচ সে পারলেই এই বদভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারতো। (বুখারি)।

সুতরাং, সুন্দর সমাজের জন্য গিবত নামক বদভ্যাসটা দূর করতে হবে, আর যদি কারো ব্যাপারে ভুল করে গিবত করে ফেলি- তবে তাৎক্ষণিক কাফফারা আদায় করতে হবে। আর কাফফারা হলো- আল্লাহ’র কাছে নিজের ও যার ব্যাপারে আমরা গিবত করেছি তার মাগফিরাতের কামনা করা।

Hits: 4

Comments
Loading...