Hits: 6

একটি বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা

0

দিনটা ছিলো শুক্রবার। বিকাল ৪টায় অফিসে লিনাক্স-এর ক্লাস হবে। যথা সময়ে অফিসে আসলাম। আমি অফিসের কাজ করলাম আর নেট-এ মেইল চেক করলাম। অন্যদিকে  শাহাদাৎ ভাই লিনাক্স -এর ক্লাস নিলেন। এরই মধ্যে ৭টা বেজে গেলো। আমি পাভেল ও ছোট ভাই সুমনকে বললাম চলো পাদ্মার পাড়ে ঘুরে আসি। ওরা রাজি হল। আলুপট্ট্রি থেকে সোজা পদ্মার পাড়ে আমরা চলে আসলাম। মজা করে সবাই নেমে পড়লাম পদ্মার চরে। এইবার চরে হাঁটার পালা। এর আগেও চরে হেটেছি কিন্তু গত কালের (০৮ মে ২০১১)  মত মজা পাইনি। সে এক অন্য রকম অনুভুতি। আমরা তিনজনে কখনো বা মজা – ইয়ার্কি করছি ; আবার কখনো বা ছেলে মানুষি করছি নিজেদের মত করে।

 

চরে হাটতে হাটতে  অনেক কিছুই চোখে পড়লো। সে রকম একটা বিষয় না উল্লেখ করে পারছিনা। অবশ্য আমার এটাতে মজা করেছি। আলুপট্ট্রি মোড়ে আমরা ভাজা কিনে খেতে খেতে পদ্মার দিকে আসছিলাম। তাই আমাদের হাতে মরিচের ঝাল লেগেছিলো। আমরা পদ্মার চরে মজা করছি আর বড়কুঠির দিকে যাচ্ছি। কিছু দূর যেতে দেখি একটা ছেলে আর একটা মেয়ে পদ্মার একেবারে ধারে (পানির কাছে) নির্জনে গল্পো করছে। আমরাও কম না। পাভেল বললো চলো পানির ধারে যাই। আমি আর সুমন বললাম চলো যাই আমার চোখ মুছতে যেয়ে মরিচের ঝাল চোখে লেগেছে। আমরা মজা করছি আর সেই কপত-কপতির নিকটবর্তী হচ্ছি। আমরা যখন তাদের প্রায় কাছে চলে আসলাম, তখন তারা প্রায় ভয় পেয়ে গেলো। আমরা বিষয়টা বুঝতে পারলাম এবং তাদের থেকে দূরে সরে আমাদের গন্তব্যের দিকে এগোলাম। মজা করছি আর পদ্মা পাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বড়কুঠির কাছে পৌছলাম। এখানে আমাদের একটা  মজার ঘটনা আছে। সেটা নিয়ে আমি আর সুমন পাভেলের সাথে মজা করছি। উল্লেখ্য আকাশে তখন মেঘ। মাঝে মাঝে বিজলি চমকালেও আমরা তা আমলে নেইনি।

 

হঠাৎ সামান্য বাতাস দেখে সুমন বললো ভাইয়া ইশরাফিলকে ফোন করেন। পাভেল বললো ইশরাফিল কেন মিকাঈলকে! আমিও মজা করে ফোন করার ভান করে বললাম, ‘‘হেল্লো… কে মিকাঈল ? হ্যাঁ… ঝড় আসবে ……? কী এখোনি চলে যাবো ? …………… আচ্ছা…”।  পাভেলকে বললাম চলো যাই ঝড় হবে…………। কথাটা শেষও করতে পারলাম না, ঝড় শুরু হয়ে গেল। প্রচন্ড ধুলা-বালির ঝড়। তাও আবার পদ্মা পাড়ের। উল্লেখ্য আমাদের এইসন কথোপকথণ আসপাসের কয়েক জন সুনছিলো। জানি না কে কি মনে করলো। তবে একজন ছেলে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। হয়তো সে মনে করেছিল আমি সত্যি সত্যি মিকাঈল-এর সাথে যোগাযোগ করছি!!??!!

 

ঝড় শুরু হলেও আমরা তখন চলে আসিনি। অল্প কিছু পর দেখি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি পাভেল আর সুমন দৌড় শুরু করলাম বড়কুঠি থেকে সাহেব বাজারের দিকে। এখানেও একটা মজার ঘটনা ঘটলো। আমরা দৌড় শুরু করলে পাভেল মজা করে দৌড়াতে দৌড়াতে বললো “ ধর ধর ধর ধর……” ঠিক যেমনটা প্রতি পক্ষকে আক্রমন করলে বলে। সে আবার বললো “ধর ধর ধর চোর চোর চোর”…। এইবার কয়েকজন হুজুগে বাঙ্গালি সত্যি সত্যি হুজুগে দৌড়াতে শুরু করলো। আমরাও মজা পেলাম।

 

যায় হোক আমরা সেই যে দৌড় শুরু করলাম একেবারে মসজিদ মিশন ঙ্কুলের সামনে এসে দাড়ালাম। ভাবলাম দারজা খুলা থাকলে আশ্রয় নিবো। কিন্তু বিধি-বাম, দারজা বন্ধ। এরই মধ্যে আমরা অনেকখানি ভিজে গেছি। কী আর করার কিছুক্ষন ভাবলাম। এইবার সামনের দিকে আগাতেই আরেক ঝটকা বৃষ্টি । আশ্রয় নিলাম নবনির্মিত একটা ভবনে। উল্লেখ্য আমাদের আগেই অনেক মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছে বৃষ্টি্র হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য। যায়-হোক, এতক্ষনে নিজের দিকে নজর দিতে এক দফা  চমকে উঠলাম। এ-কী সমস্ত মুখমন্ডল আর শরীর বালুতে ভর্তি। দুর্ভাগ্য-বসত এ-দিন আমার প্রিয় রুমালটাও নিয়ে আস্তে ভুলেগ্যাছি। কি আর করার কোন রকম মুখ মোছার ব্যার্থ চেষ্টা করলাম। খেয়াল করলাম আমাদের সবার (আমার, পাভেল ও সুমনের) মোবাইল এবং মানি-ব্যাগ অল্পের জন্য ভিজে নাই। যাই হোক আমি আর সুমন দুইজন  নিজ নিজ মানি-ব্যাগ থেকে পলিথিন বের করে মোবাইল ও মানি-ব্যাগ রক্ষা করার চেষ্টা করলাম।  এরই মধ্যে আমাদের প্রিয় মামা পাভেল একটা কান্ড ঘটাল… সে তার গায়ের টি-শার্ট খুলে ফেল্লো। আমি আর সুমন পাভেল কে নিয়া একটু মজা করলাম। এভাবে বৃষ্টি্র মধ্যে আমাদের মজা চলতে থাকল। আমরা তিনজন নিজেদের মত করে মজা করলাম। এরই মধ্যে বৃষ্টি কমে গেল। এইবার বাড়ীর পথে রওয়ানা হবার পালা।

 

বাড়ীর উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামতে যেয়ে আমার চোখ তো কপালে……………। রাস্তায় প্রচুর পানি জমেছে। জুতা বা সেন্ডেল কনোটাই রক্ষা পাবার সুযোগ নাই। কি আর করার দ্রুত সীদ্ধান্ত নেয়ার একটা অভ্যাস আমার আছে। সীদ্ধান্ত নিলাম যা হবার হবে, পানিতে আমি জুতা পরেই নামবো। যে ভাবা সেই কাজ। জুতা পরে পানিতে নেমে পড়লাম। আমরা সাহেব বাজার বড় মসজিদ পার হয়ে জিরো পয়েন্টে দাড়ালাম। “ ওই অটো…!! যাবে ?” – আমি বললাম।  “ হা যাবো” – অটো চালক বলল। বললাম -“ শালবাগান কতো নিবেন”?  উত্তর পেলাম – “চল্লিশ টাকা”। পাভেল মাথা ঝাকিয়ে আমাকে না সূচক ইশারা করল। ছেড়ে দিলাম অটো। এইবার আরেক বিপদ! আর কোন অটো শালবাগানে যেতে চাচ্ছে না। পাভেল সামনের দিকে আগানোর কথা বলল। আমরা সাহেব বাজার ফুটপাত ধরে বাটার মোড়ের দিকে আগাতে থাকলাম। i-ota- এর সামনে এসে আরেক বিপদে পড়লাম। রাস্তায় প্রচুর পানি জমেছে। গোটা জুতা ডুবে যাচ্ছে। আরেক দফা সিদ্ধান্ত নিলাম যা হবার হবে সামনের দিকেই আগাবো! পিছে ফিরব না। পানিতে নেমে পড়লাম। জুতার মধ্যে পানি ঢুকে পড়ল। বিরক্তিকর লাগছে। তার পরও কিছু করার নাই। বাটার পাসে এপেক্স-এর সামনে তিনজন দাড়ালাম।

 

এপেক্স-এর সামনে তিনজন দাঁড়িয়ে মজা করছি। সব গুলো অটো ভর্তি। কোনটাই ফাঁকা নাই।  সুমন তো এইবার শুরু করেই দিল অই ভাই “শালবাগান ?” “শালবাগান ?” “শালবাগান ?” – যেন আজ আমরাই অটো চালক !!! অন্যান্য দিন ঠিক যেভাবে অটো চালকরা ডাকে; আজ আমরা নিজেদের প্রয়োজনে ডাকছি। এবারও বিধি-বাম, আমাদের কপালে যে পায়ে হেটে বাড়ি ফেরা লেখা আছে! আমি বললাম এভাবে আর নাহ, চল হাটা শুরু করি। কমসে কম সামনের দিকে তো আগানো হবে! তিনজন মিলে শালবাগানের তথা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

 

মোটামুটি ফাঁকা রাস্তা। কদাচিৎ দুই-একটা অটো পাসদিয়ে চলে যাচ্ছে। আর সুমনও বলছে… ” “শালবাগান ?” “শালবাগান ?””। এভাবেই আমরা সামনের দিকে আগাচ্ছি। মাদ্রাসা মার্কেটের সামনে এসে দেখি একটা অটো আসছে। সুমন বলল “শালবাগান ?”   অটো-চালক উত্তর দিল রিজার্ভ। আমরা না বললাম । অটো চালক চলে গেল। আবার সামনের দিকে হাটা শুরু করলাম। সুমন মজা করে আমাকে বলল… ভাই আমার গাড়ীটা নিয়ে আসলে এই অবস্থা হত না! আমি উত্তরে বললাম- তোমার টা-তো দুই চাকার গাড়ী , পানিতে ঠিকই ভিজতা। তার থেকে আমার টা আনলেও হতো। রাস্তা দিয়ে একজন ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন আর আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন । আমাদের কথা শুনে তিনি তো রিতিমতো অবাক! মনে হয় তিনি মনে করেছেন  সত্যি আমাদের মনে হয় বড়ো-সড়ো গাড়ী আছে। আমারা কথা গুলো মজা করে বললেও পাসে থেকে অন্যরা সত্যি ভাব্বে। যা-ই হোক। সামনে আগাচ্ছি। পাভেলও খুব মজা করছে। আমরা তিনজনই যেন তিনশ জনের মত।

 

অলোকার মোড়ে এসে চায়ের দোকান দেখে পাভেল বলল চলো চা খাই। আমি না সুচক জবাব দিলেও সুমন ও পাভেলের জন্য রাজি হলাম। পাভেল বলল দুধ-চা খাবে। আমি চা বিক্রেতাকে বললাম “মামা আমাকে মিকচার দেন”। পাভেল আর সুমন দুধ চায়ের অর্ডার দিল। আমি ওদের আগেই মিকচার পেয়ে গেলাম। আমি মজা করে মিকচার খেতে থাকলাম।  সুমন চা-অলাকে বলল “মামা চা-য়ে মালাই মারকে দেন”। পাভেল চা খেতে খেতে বলল “আশিষ তুমি তো ছোট মানুষ, তুমি (দুধের) মিকচার ই খাও”। ইতিমধ্যে আমার মিকচার শেষ হয়েছে। পাভেলের কথা শুনে আমি বললাম “তাই মামা! তাহলে চা খেতে বলছো। ঠিক আছে”। বললাম ” একটা কড়া-লিকারে লাল চা দেন”। আমি এইবার পাভেলদের দেখায়ে চা খেতে থাকলাম। সুমন বলল “আপনি পারেনও বটে!”। চা খাওয়া শেষ করে আবার আমরা বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। বিভিন্ন রকমের কথা আর ইয়ার্কি করতে করতে আমরা নিউমার্কেটের সামনে চলে আসলাম।

 

নিউমার্কেটের সব দোকান বন্ধ । নিঝুম রাস্তা। খুব ভালো লাগছে। আমি, পাভেল, সুমন আর রাস্তার দু’য়েকজন লোক ছাড়া আর কেউ নেই।  রাজশাহী শহরের ফাঁকা রাস্তা আমি অনেক দেখেছি, এমন-কী রাত ১টা, ২টা, ৩টা বা ৪টার ফাঁকা রাস্তাও আমি দেখেছি। কখনো-বা একাও হেঁটেছি অনেক অনেক বার। কিন্তু আজ বৃষ্টি ভেজা এই রাতের মত রাস্তা কোন দিন আমি দেখার সুযোগ পাইনি। আজ একটা নতুন অভিজ্ঞতা হল আমার। খুব চমৎকান লাগছে রাতের বৃষ্টি ভেজা ফাঁকা রাস্তা আর চারিপাশ। আমি যে এ মজা বা সৌন্দর্য উপভোগ করছি তা পাভেল বা সুমন কেউ-ই বুঝতে পারল না। আমি ওদের সাথে কথার তাল দিয়ে মজা করছি আর হাটছি। এসবের মাঝেও সুমন সেই কথা ছাড়েনি…… “” অই ভাই “শালবাগান ?” “শালবাগান ?” “শালবাগান ?” “”

 

যাই হোক আমরা রেলগেট,  স্টেডিয়াম, পলিটেকনিক হয়ে শালবাগানের সামনে আলম পেট্রোল পাম্পের সামনে চলে আসলাম। এখানে সুমন আবার বলল … “” ভাই আমার গাড়ীটা নিয়ে আসলে এতো কষ্ট হত না!””  আমি উত্তরে বললাম- “” তোমার টা-তো দুই চাকার গাড়ী , পানিতে ভিজে যেতে। তার থেকে আমার হেলিকপ্টারটা আনলেও হতো।””  আমাদের সামনে একটা লোক স্ব-পরিবারে হয়তো আমাদের মত অটো না পেয়ে বাড়ী ফিরছিলো। আমাদের কথাগুলোর মজা তারাও উপভোগ করছিলো। হয়-তো সে লোকটা  আমদের দেখে অতীতের কথা গুলো মনে করে মজা পাচ্ছিলো। এসব করতে করতে আমরা শালবাগান পাওয়ার হাউস হয়ে প্রফেসর পাড়াতে চলে আসলাম। সুমন বলল ” এই যাহ আমরা তো হাটতে হাটতে বাড়ীতে চলে আসলাম। ”

 

কী আর করার। চলেই যখন এসেছি! সবাই আমরা নিজ নিজ গৃহের দিকে ফিরলাম। একে অন্যের কাছ থেকে পরের দিন পর্যন্ত বিদায় নিলাম। বাড়িতে ফিরে সকলের-ই পোষাক পরিবর্তন করা জরুরী। আজকের দিনটা এক রকম স্মৃতির পাতায় স্মৃতিময় হয়ে থাকবে আর আনন্দ দিবে।

Hits: 6

Comments
Loading...