পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্র

বাংলার পাটশিল্পঃ দেশ ভাগের আগে বাংলায় মোট ১১১ টি পাটকল ছিলো, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার সবগুলোই ছিলো কলকাতার আশেপাশে। গোটা পূর্ব বাংলায় ১ টা পাটকলও ছিলোনা! অথচ বাংলার মোট ৯০% পাটই উৎপাদিত হতো পূর্ব বাংলায়। কলকাতার মিল মালিকেরা পুর্ববাংলার কৃষকদের থেকে খুবই কম মুল্যে পাট কিনে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে ইংরেজদের সহায়তায় বিভিন্ন দেশি/বিদেশি ক্রেতাদের কাছে চড়া মুল্যে বিক্রয় করতো। আমাদের পাটের উপর নির্ভর করে কলকাতার পাটকলগুলো চলতো, সেখানে লক্ষ লক্ষ কলকাতাবাসীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিলো, অথচ আমরা কর্মসংস্থানের অভাবে অর্ধাহারে দিন কাটাতাম। মুসলিম অধ্যুসিত পূর্ববাংলার মানুষের সাথে ইংরেজদের করা বৈষম্যের মাত্রা দেখুন!

৭৫ টি জুটমিলঃ কোনো পাটকল না থাকার ফলে দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের পাট শিল্প মুখ থুবড়ে পরে। দেশের পাটচাষিরা পরে চরম বিপাকে। এই অবস্থা দুর করতে পাক সরকার ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে মাত্র ২০ বছরে পূর্ব পাকিস্তানে মোট ৭৫ টি জুটমিল স্থাপন করে। ফলে পাট তার সৌনালী যুগ ফিরে পায় এবং সেসময় পাট হয়ে উঠে এই অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল।

বিপরীতে কলকাতায় ১১১ টা পাটকল থাকলেও পূর্ববাংলা থেকে পাট আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাচাঁমালের অভাবে কলকাতার অনেক পাটকল দেউলিয়া হয়ে যায় কিন্তু দুঃখ্যের বিষয় হল, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ৬৮ টি পাটকলকে জাতীয়করণ করে৷ আর তখন থেকেই পাটশিল্প সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের লুটতরাজের স্বীকার হতে শুরু করে। ফলে বেশিরভাগ সরকারি পাটকল টানা লোকসান করতে থাকে। এর পর একে একে অনেকগুলো পাটকল বন্ধ হয়ে যায়, বাংলাদেশ তার পাট শিল্পের সুনাম হারায়। বিপরীতে কলকাতার পাট শিল্প পুনরায় চাঙা হয়ে উঠে। অবশেষে ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সমস্ত সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেয়।

আদমজী পাটকলঃ ১৯৫১ সালে পাকিস্তান আমলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীরে প্রতিষ্ঠিত হয় পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল “আদমজী জুটমিল”। একই সাথে এটি ছিলো এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ কারখানা। সেই আমলেই কারখানাটিতে তাঁতকল বসানো হয় ৩ হাজার ৩০০টি! আদমজী জুট মিলে উৎপাদিত চট, কার্পেটসহ বিভিন্ন প্রকার পাটজাত দব্য দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি হতো চীন, ভারত, কানাডা, আমেরিকা, থাইল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। কারখানা স্থাপনের ফলে ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এটিকে একসময় বলা হত প্রাচ্যের ডান্ডি। কিন্তু ১৯৭২ সালের জাতীয়করণের পর থেকে আদমজী পাটকল আর লাভের মুখ দেখতে পারেনি।

আদমজী পাটকল

আদমজী পাটকল

পাট শিল্প নিয়ে প্রচলিত গুজবঃ বাংলাদেশের এক শ্রেনীর মানুষ সবসময় অভিযোগ করে যে, পুর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানির টাকার পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন করা হয়েছে। বাস্তব এটা একটা মুর্খের মত অভিযোগ।

ধরুন আপনি সৌদিআরব গিয়ে একটা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান খুলে প্রচুর টাকা কামালেন। তো সেই টাকা দিয়ে আপনি কি করবেন? সৌদির পেছনে খরচ করবেন, নাকি নিজ দেশে নিয়ে আসবেন? নিশ্চই দেশে নিয়ে আসবেন। সেক্ষেত্রে সৌদিরা কি অভিযোগ করতে করবে যে আপনি সৌদির টাকা পাচার করছেন? কখনোই না।

একই বিষয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। আগেই বলেছি ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে কোনো পাকটল ছিলোনা। পাকিস্তান আমলে ৭৫ টা পাটকল তৈরি হয়৷ কিছু পাটকলের মালিক ছিলো পাকিস্তান সরকার, কিন্তু বেশিরভাগ পাটকলের মালিক ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাবসাহীরা। যেমনঃ সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজীর মালিক ছিলো করাচীর বাসিন্দা আবদুল ওয়াহিদ আদমজী। ফলে এসব ব্যাবসাহীরা তাদের ব্যবসার লভ্যাংস নিজ এলাকায় অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যেত। তাহলে পাকিস্তানিরা আমাদের সাথে কোথায় অবিচার করলো? নাকি অন্যের ব্যাবসার লভ্যাংস ভোগ করতে চান?

ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলা ছিলো ভারতবর্ষের সবচেয়ে শোষিত, নিপিড়ীত অঞ্চল। এই অঞ্চলের মানুষ এতটাই দরিদ্র ছিলো যে, নিজেরা কোনো পাটকল নির্মান করতে সক্ষম হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এই অঞ্চলের পাটশিল্পে বিনিয়োগ করে পাটকল স্থাপনের ফলে পুর্ব পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এসব পাটকল না বানালে এদেশের পাট চাষিরা পাট বিক্রি করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে যেত। লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতো না। পাট শিল্পেরও বিকাশ ঘটতো না। এই অঞ্চল আরো বেশি পিছিয়ে পরতো।

১০ টি সুগার মিলঃ ব্রিটিশ আমলে বাংলায় চিনিকল ছিলো ১৬৬ টা, তার ভেতর পুর্ববাংলায় ছিলো মাত্র ৪ টা, বাকি সব ছিলো কলকাতায়! বর্তমানে বাংলাদেশে চিনিকল রয়েছে ১৭ টি, যার ভেতর ৪ টি প্রতিষ্ঠা হয় ব্রিটিশ আমলে, ১০ টি প্রতিষ্ঠা হয় পাকিস্তান আমলে, আর স্বাধীনতার পর এপর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৩ টি চিনিকল। পাকিস্তান আমলে নির্মিত চিনিকল গুলো হলো….
♦ কুষ্টিয়া চিনি কল, ১৯৬১
♦ জয়পুরহাট চিনি কল, ১৯৬০
♦ ঝিল বাংলা চিনি কল, ১৯৫৭
♦ ঠাকুরগাঁও চিনি কল, ১৯৫৬
♦ পঞ্চগড় চিনি কল, ১৯৬৫
♦ মোবারকগঞ্জ চিনি কল, ১৯৬৫
♦ রংপুর চিনি কল, ১৯৫৪
♦ রাজশাহী চিনি কল, ১৯৬২
♦ শ্যামপুর চিনি কল, ১৯৬৫
♦ কালিয়াচাপড়া চিনি কল, ১৯৬৫

তবে এগুলোর পরিনতিও পাটকলের মতই হয়। প্রথমে প্রতিটি চিনিকল লাভজনক থাকলেও ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর থেকে চিনিকল গুলো প্রতি ১০ বছরের ভেতর ৬ বছরই লোকসান করতে থাকে। অথচ এদেশে চিনির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চিনি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

৫৬ টি বস্ত্রকলঃ ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলায় মাত্র ৮ টি বস্ত্রকল ছিলো। মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে পাকিস্তান সরকার আরো ৫৬ টি বস্ত্রকল তৈরি করে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে বস্ত্রকল আছে ৬৫ টি। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর থেকে বর্তমানে এগুলোর অবস্থাও বেশ নাজুক। বর্তমানে আমাদেরকে বিদেশ থেকে কাপড়/সুতা আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটাতে হয়।

সুতা শিল্পঃ ব্রিটিশ আমলে এদেশে সুতা শিল্পের বিকাশ ঘটে। তখন এই অঞ্চলে বিভিন্ন কারখানায় সর্বোমোট ১১ লক্ষ টাকু ও ২৭ হাজার তাঁত ছিল। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান আমলে এর ব্যাপক উন্নয়নে টাকুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ লাখে এবং তাঁত সংখ্যা হয় ৬৮ হাজার। কিন্তু ১৯৭২ সালে মুজিব সরকার সুতাকল গুলো জাতীয়করণের পর সুতা শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হয়। বেশিরভাগ টাকু নস্ট হয়ে গিয়ে এর সংখ্যা মাত্র ৮০ হাজারে নেমে যায়। পরবর্তীতে আশির দশকে এরশাদ সরকার রাষ্ট্রিয় সুতাকল গুলোকে বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু করলে দেশের সুতাশিল্প আবার বিকশিত হতে শুরু করে।

৭ টি কাগজ কলঃ ব্রিটিশ আমলে বাংলায় ১৬ টা কাগজ কল থাকলেও তার একটাও পুর্ব বাংলায় ছিলোনা। পাকিস্তান আমলেই দেশে কাগজ শিল্পের বিকাশ ঘটে। দেশে সর্বপ্রথম কাগজকল স্থাপন করা হয় ১৯৫৩ সালে রাঙামাটি জেলার চন্দ্রঘোনায় কর্ণফূলী কাগজকল। সরকারি অর্থায়নে তৈরি এই কারখানাটি ছিলো এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তর এবং শ্রেষ্ঠ মানের কাগজের কল। আমাদের কর্নফুলীর মত এত উন্নত মানের কাগজ কেবল ভারত কেন, এশিয়ার কোনো দেশই তৈরি করতে পারতো না। কেবল এই কারখানাতেই কর্মসংস্থান হয় ৩০ হাজার বাঙালীর।

১৯৫৯ সালে পাক সরকার তৈরি করে খুলনা নিউজপ্রিন্ট কাগজকল যা ছিল কর্নফুলীর চেয়েও বড় আকারের প্রতিষ্ঠান! তখন কর্নফুলীকে পেছনে ফেলে এটি হয়ে যায় এশিয়ার বৃহত্তর কাগজকল! সেসময় আমরা রেগর্ড গড়তাম, আমরাই আবার সেটাকে ভেঙে নতুন রেকর্ড বানাতাম!
সব মিলিয়ে পাকিস্তান আমলে ৭ টি কাগজ কল প্রতিষ্ঠিত হয়। আর স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার মাত্র ১ টি কাগজ কল তৈরি করেছে (সিলেট কাগজ কল), সেটা আবার প্রতবছর কেবল লোকসানই করছে।

১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর থেকে কাগজ কলগুলো অতিতের ঐতিহ্য হারায়। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সরকার দেশের সবচেয়ে বড় কাগজকল “খুলনা নিউজপ্রিন্ট কাগজকল” বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বাকিগুলো অবস্থাও নাজুক। পাকিস্তান আমলে এদেশ কাগজ শিল্পে স্বনির্ভর থাকলেও বর্তমানে আমরা ভারত থেকে কাগজ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রমের সরকারি বই আমদানি করতে হয়!

এশিয়ার প্রথম সার কারখানাঃ বাংলাদেশে সার শিল্পের বিকাশও ঘটে পাকিস্তান আমলে। ১৯৬১ সালের আগ পর্যন্ত গোটা এশিয়া মহাদেশে কোনো সার কারখানা ছিলোনা। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার সিলেটে স্থাপিত করে গোটা এশিয়া মহাদেশের প্রথম সার কারখানা “ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা”। তবে সেই ঐতিহাসিক কারখানা আজ আদমজী পাটকলের মতই ভগ্নস্তূপের মত পরে আছে। কয়েক বছর আগে এটাকে নিলামে তুলে বিক্রি করে দেয়া হয়। বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটাতে সার আমদানি করতে হয়। এছাড়া পাক সরকার আরো প্রতিষ্ঠা করে…

টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড (দেশের একমাত্র TSP সার কারখানা)
ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরী লিমিটেড

চামড়া শিল্পঃ ইংরেজি আমলে ১৯৪০ সালে এই অঞ্চলে চমড়া ব্যাবসার প্রচলন শুরু হয়। তবে সেটা চামড়ায় লবন লাগিয়ে কলকাতায় পাঠানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান আমলে এদেশে চামড়া খ্যাত শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন হাজারিবাগ এলাকায় অনেকগুলো চামড়া শিল্প কারখানা গড়ে উঠে। এর ভেতর ৩০ টি কারখানার মালিক ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকরা। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সরকার সেই কারখানাগুলো জব্দ করে নেয়। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প সমৃদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পাট শিল্পের মত প্রায় ধ্বংসই হয়ে গেছে।

ইস্পাত শিল্পঃ দেশ ভাগের সময় পশ্চিম বাংলায় ১৮ টি ইস্পাত কারখানা ছিলো। অথচ গোটা পুর্ববাংলায় ১ টা কারখানাও ছিলোনা। ফলে লোহা/রডের অভাবে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ব্যাহত হতে থাকে। এই অবস্থা উত্তরণের লক্ষে ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে নির্মিত হয় দেশের প্রথম রড তৈরির কারখানা ‘ইস্ট বেঙ্গল রি-রোলিং মিলস’। সেই সাথে এদেশের ইস্পাত শিল্পের ইতিহাসও শুরু হয়৷ বর্তমানে সেই প্রতিষ্ঠানটিই হচ্ছে দেশের সেরা ইস্পাত শিল্প প্রতিষ্ঠান BSRM

জাহাজ ভাঙা শিল্পঃ ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে গ্রিস থেকে আনা একটি জাহাজকে সফলভাবে ভাঙ্গার মধ্যদিয়ে এদেশের জাহাজ শিল্পের বিকাশ ঘটে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প।

প্রগতি ইন্ড্রাস্টিজ লিমিটেডঃ দেশের প্রথম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ড্রাস্টিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান আমলে। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের জেনারেল মোটরস-এর কারিগরী সহযোগিতায় চট্টগ্রামের বাড়বকুন্ডে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। অথচ সেই আমলে পশ্চিম পাকিস্তানেও এরকম কোনো প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়নি। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান, যা এ পর্যন্ত ৫০,০০০ এর অধিক প্রাইভেট কার, জিপ, বাস, ট্রাক, পিকাপ, অ্যাম্বুলেন্স, ও ট্রাক্টর সংযোজন করেছে।

এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডঃ পূর্ব পাকিস্তানে মোটর সাইকেল সংযোজনের লক্ষ্যে “হন্ডা” কম্পানীর কারিগরি সহায়তায় ১৯৬৬ সালে টঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত হয় “সিরাজি গ্রুপ এটলাস লিমিটেড” নামক দেশের প্রথম মোটর সাইকেই সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এর নাম এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড।

ইস্টার্ন রিফাইনারি তৈল শোধনাগারঃ এটি বাংলাদেশের একমাত্র অপরিশোধিত তেল শোধনাগার। ১৯৬৩ সালে একদল পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্প-উদ্যোক্তা এর নির্মান শুরু করে এবং এটি তেল পরিশোধন শুরু করে ১৯৬৮ সালে। এই কারখানাটি থাকার কারনে আমরা কম দামে অপরিশোধিত তেল কিনে এনে নিজেরা শোধনের মাধ্যমে সল্প মুল্যে জ্বালানী তেল সর্বরাহ করতে পারছি। স্বাধীনতার পর সরকার এটাকেও জব্দ করে নেয়। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ২য় কোন তেল শোধনাগার ফ্যাক্টরি নির্মিত হয়নি।

এশিয়ার প্রথম রেয়ন ফ্যাক্টরিঃ ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকার চট্টোগ্রামে প্রতিষ্ঠা করে এশিয়া মহাদেশের প্রথম রেয়ন মিল “কর্ণফুলী রেয়ন এন্ড কেমিক্যালস লিমিটেড”

গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানাঃ দেশের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম করে তুলতে পাকিস্তান সরকার ১৯৭০ সালের ৬ই এপ্রিল গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা করে “গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা”, যা বর্তমানে বাংলাদেশ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি নামে পরিচিত। এখানে সামরিক বাহিনীর জন্য বিভিন্ন অস্ত্র, কামান, বিস্ফোরক, গেজেট ইত্যাদি তৈরি করা হয়।

রেলওয়ে শিল্পঃ পাকিস্তান আমলে রেলখ্যাত বগি, ওয়াগন নির্মানের মধ্য দিয়ে শিল্পে উপনীত হয়। এর ইতিহাস অনেক বড় বিধায় অন্য একটি পোস্টে এ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

এছাড়া ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাঃ-
♦ খাদ্য উৎপাদনকারী ৪০৮টি
♦ পানীয় প্রস্ত্ততকারী ৬টি
♦ তামাক প্রক্রিয়াকরণ ২৬টি
♦ ম্যাচ ফ্যাক্টরি ১৮টি
♦ আসবাবপত্র ৭০টি
♦ কাগজজাত দ্রব্য উৎপাদন ৩৩টি
♦ মুদ্রণ ও প্রকাশনা ১৪টি
♦ রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন ৫৭২টি
♦ পেট্রোলিয়াম ও কয়লাজাত পদার্থ ৩টি
♦ রাবারজাত দ্রব্য উৎপাদন ৩টি
♦ খনিজ পদার্থ ৫৩টি
♦ মৌলিক ধাতু ৩৫টি
♦ ধাতব দ্রব্য ২৫৭টি
♦ অবৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ৮৮টি
♦ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ৩৪টি
♦ যোগাযোগ যন্ত্রপাতি ৬৫টি
♦ অন্যান্য দ্রব্য ১৬৬টি।

এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পের উন্নয়নের জন্যে পাকিস্তান সরকার গড়ে তোলে…
ইস্ট পাকিস্তান ইন্ড্রাস্টিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন” (EPIDC)ঃ শিল্পায়নের উন্নয়নের জন্য পাকিস্তান সরকার এই সংস্থাটি সৃষ্টি করে। পাট, পেপার বোর্ড, সিমেন্ট, সার, চিনি, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, বস্ত্র, ঔষধ, হাল্কা প্রকৌশল ও জাহাজনির্মাণ প্রভৃতি খাতে শিল্প ইউনিট স্থাপনে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
জুট রিচার্স ইনস্টিটিউট (বর্তমানে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত)
বন শিল্প কর্পোরেশন
পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক
পাকিস্তান শিল্প অর্থসংস্থান কর্পোরেশন

পাকিস্তান আমলে পুর্ব পাকিস্তানে যে কয়েকজন বিজনেস টাইকুন ছিল তাদের মধ্যে এ.কে. খান অন্যতম। ১৯৪৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এ.কে. খান কোম্পানি লিমিটেড। এই কম্পানিটি টেক্সটাইল, শিপিং, পাট, ইলেকট্রনিক মটরস, ম্যাচ ও পলিউড, প্রথম বাঙালি মালিকানাধীন ব্যাংকসহ বহুসংখ্যক শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে রাখে অনন্য অবদান।

১৯৫৮ সালে এ.কে. খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন এবং পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বিভাগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিভাগগুলো হলো.. শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ। শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বস্ত্র ও পাট শিল্পের দ্রুত প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানা, কর্ণফুলী রেয়ন মিল স্থাপন এবং পশ্চিম পাকিস্তানেও অনুরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। (লক্ষ করুন, বাঙালীরাও পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মান করেছিলো)

শিল্পায়নের ইতিহাসঃ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরে দেখা গেলো এই অঞ্চলের মাত্র ১২% লোক নিজের নাম লিখতে বা পড়তে পারে। আর পুরো অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো মাত্র ১ টি (ঢাবি)। ফলে শিক্ষিত জনশক্তি এবং উচ্চশিক্ষার অভাবে এই অঞ্চলে অফিস-আদালতের মত শিক্ষা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নির্মান লাভজনক ছিলোনা। বিপরীতে এই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণে কর্মঠ বেকার জনগোষ্ঠী ছিলো।

এই কর্মঠ বেকার জনগোষ্ঠীকে দেশীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করার লক্ষে পাকিস্তান সরকার এই অঞ্চলকে শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহন করে। সেই ধারাবাহিকতায় সম্পুর্ন কৃষি নির্ভর পুর্ব পাকিস্তানে হঠাৎ করেই শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। ফলে কৃষি নির্ভর জীবন ব্যাবস্থায় সীমাবদ্ধ পুর্ব পাকিস্তানে খুব দ্রুত নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সরকার চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জকে শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলে। বর্তমানে এই দুই শহরে অবস্থিত বেশিরভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানই পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত।

পাকিস্তান আমলে এদেশে শিল্পায়নের প্রধান বিনিয়োগকারী ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাবসাহীরা৷ ফলে এই অঞ্চলের অন্তত ৬০% শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীরা, বাকি ৪০% শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিলো পাকিস্তান সরকার অথবা বাঙালীদের মালিকানায়। এর প্রধান কারন, ব্রিটিশ আমল থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানে অসংখ্য ধনী ব্যাবসাহী পরিবার ছিলো। বলাহত পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতো ২২ টি গ্রুপ (বর্তমানে যেমন আছেঃ বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ)। এই ২২ টি গ্রুপের মধ্যে ২১ টিই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দাদের, বাকি ১ টি গ্রুপ ছিলো পূর্ব পাকিস্তানেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই পুর্ববাংলার জনগণ এতটাই দরিদ্র এবং পিছিয়ে ছিলো যে নিজ উদ্দোগে একটা পাটকল পর্যন্ত বানাতে পারেনি।

আমরা বিশ্বাস করি, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বাঙালীদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিলো। কিন্তু মুলত সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাবসাহীদেরকে। কারন যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সরকার এদেশে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানিদের শত শত শিল্প প্রতিষ্ঠান জব্দ করে নেয়। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাবসাহীরা তাদের শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো হারিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পরে। অনেক ব্যাক্তি তাদের সর্বোস্ব হারায়। বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার সম্পুর্ন ফ্রিতে শত শত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকারের জব্দকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা..
পশ্চিম পাকিস্তানীদের মালিকানাধীন….
বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানঃ ১১ টি
মাঝারি-ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানঃ ৪০০ টি
পশ্চিম এবং পুর্ব পাকিস্তানীদের যৌথ মালিকানাধীন..
বৃহৎ-মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানঃ ৭৫ টি।
ইস্ট পাকিস্তান ইন্ড্রাস্টিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন (EPIDC) মালিকানাধীন….
বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানঃ ৫৩ টি।

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালনের মুহূর্তে শেখ মুজিব সরকার জাতীয়করণ আইন পাশ করে। Bangladesh Nationalization Act 1972-এর আওতায় দেশের প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের আগে এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাক্তি মালিকানায় থাকা অবস্থায় লাভজনক থাকলেও ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর থেকে সরকারি আমলাদের দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের লুটতরাজের কবলে পরে প্রতিষ্ঠান গুলো লস মেকিং মেশিনে পরিনত হয়।

এমনকি বাংলাদেশে ব্যাক্তি মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ব্যাহত করতে মুজিব সরকার ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ লাখ টাকায় বেঁধে দেয়। ফলে বাংলাদেশে ব্যাক্তি উদ্দোগে বৃহৎ এবং মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি আরোও আইন করা হয় যে, ব্যাক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাবস্যার মাধ্যমে আয় করে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পুজি গঠন করাতে পারবে, এর বেশি নয়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত খাতের ভূমিকাকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়। মুজিব সরকারের এই আইনের ফলে দেশের শিল্পখ্যাতে ধ্বস নামে। তবে মজার ব্যাপার হলো, মুজিব পরবর্তী সকল সরকার এমনকি বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারও মুজিব সরকারের এই আইকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দেশে ব্যাক্তি মালিকানাধীন শিল্পের বিকাশে সহায়তা করেছে।

সরকারি সূত্রমতে, ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ১,৫৮০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ২,০৬,০৫৮ জন লোক নিয়োগ করা হয়েছিল। তাদের মোট উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য ছিল ৩,৬৩৬ বিলিয়ন টাকা এবং মূল্য সংযোজিত হয়েছিল ১,৭০৮ বিলিয়ন টাকা। ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের মোট জাতীয় আয়ে শিল্পখাতের অংশ ছিল মাত্র ৩.৯ শতাংশ। কিন্তু সরকারের ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে ১৯৭০ সালে তা বেড়ে দাড়ায় ৮.৯ শতাংশ। ৫০ বছর পর বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মোট জাতীয় আয়ে শিল্পের অবদান প্রায় ৩০.৪২ শতাংশ।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬৯ সালে….
অবিভক্ত পাকিস্তানের GDP গ্রোথ ছিলো ১১.৪
চিরশত্রু ভারতের GDP গ্রোথ ছিলো ৫.২
আর বেজন্মা ইসরাইলের GDP গ্রোথ ছিলো -০.৮ (ঋণাত্বক)
অর্থাৎ ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তান ছিলো বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিশালী দেশ। পাকিস্তানের তুলনায় তার শত্রুরা অর্থনৈতিক ভাবে ছিলো নিতান্তই দুর্বল। অর্থনৈতিক, বানিজ্যিক সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের চেয়ে ভারত অনেক অনেক পিছিয়ে ছিলো, এমনকি চীনও পিছিয়ে ছিলো পাকিস্তানের চেয়ে। অথচ দেশ ভাগের পর ৫০ বছর হয়ে গেলেও আজ অবধি বাংলাদেশ বা পাকিস্তান কেউই সেই ২ সংখ্যার GDP গ্রোথ অর্জন করতে পারেনি।

পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্র পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্র Reviewed by বায়ান্ন on July 27, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.