বিবাহের বয়স : কোরআন মজীদ ও বাস্তবতা

و عسی ان تکرهوا شيئاً و هو خير لکم و عسی ان تحبوا شيئاً و هو شر لکم. و الله يعلم و انتم لا تعلمون.
“হতে পারে তোমরা এমন কিছু অপসন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং হতে পারে তোমরা এমন কিছু পসন্দ করছো যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর; আল্লাহ্ জানেন আর তোমরা জানো না।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২১৬)
ইসলামের সকল মাযহাব্ ও ফিরক্বাহর মুজতাহিদ ও মনীষীগণের সর্বসম্মত মত (ইজমা‘এ উম্মাহ্) হচ্ছে এই যে, ইসলাম বিবাহের জন্য কোনো ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে দেয় নি। এর উপসংহার এই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে বাল্য বিবাহও বৈধ। তবে যেহেতু অপ্রাপ্তবয়স্ক (নাবালেগ) ছেলে বা মেয়ে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার রাখে না সেহেতু কেবল অভিভাবকই অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের বিবাহ দেয়ার অধিকার রাখেন।
তেমনি এ ব্যাপারেও সর্বসম্মত মত আছে যে, অভিভাবক যে নাবালেগের বিবাহ দিয়েছে সে বালেগ হওয়ার পর যদি ঐ বিবাহকে মেনে নিতে না চায় তো বিবাহ বাত্বিল্ হয়ে যাবে। এ থেকে যে উপসংহার আসে তা হচ্ছে এই যে, নাবালেগের বিবাহ প্রকৃত পক্ষে কোনো বিবাহ নয়, বরং দু’জন নাবালেগ ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত বিবাহের ব্যাপারে তাদের অভিভাবকদের মধ্যে বা একজন নাবালেগ ও একজন বালেগের ভবিষ্যত বিবাহের ব্যাপারে নাবালেগের অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট বালেগের মধ্যে সম্পাদিত সামাজিক সমঝোতা। (তথাপি আমরা এ ধরনের সমঝোতাকে আলোচনার সুবিধার্থে এখানে উপরোক্ত অর্থে ‘বিবাহ’ বলে এবং এ ধরনের বিবাহাধীন দু’জনকে ‘স্বামী-স্তী’ বা ‘দম্পতি’ বলে অভিহিত করছি। )
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, এ ধরনের দম্পতির মধ্যে যৌন সংসর্গ জায়েয কিনা?
এ বিষয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। তবে সঠিক মত হচ্ছে এই যে, এ ধরনের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজন যদি “প্রকৃত”ই নাবালেগ হয়ে থাকে তো তাদের মধ্যে যৌন সংসর্গ জায়েয নয়। কারণ, যেহেতু ইজমা‘এ উম্মাহ্ অনুযায়ী, এ ধরনের বিবাহের ক্ষেত্রে নাবালেগের বালেগ হওয়ার পর এ বিবাহ মেনে নেয়ার বা মেনে না নেয়ার অধিকার আছে সেহেতু দম্পতির উভয় পক্ষ বা নাবালেগ বালেগ হওয়ার আগে তাদের মধ্যে যৌন সংসর্গ জায়েয হলে “নাবালেগ কর্তৃক বালেগ হওয়ার পর বিবাহ মেনে নেয়ার বা মেনে না নেয়ার” বিষয়টি অর্থহীন হয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বালেগ ও নাবালেগের মধ্যে পার্থক্যকরণের মানদণ্ড কী? অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে একটি ছেলে বা একটি মেয়ে কখন বালেগ বা বিবাহের উপযুক্ত হয়?
বলা বাহুল্য যে, বালেগ বা বিবাহের উপযুক্ত হওয়া মানে হচ্ছে সে নিজের এখ্তিয়ারে বিবাহ করতে পারবে, যদিও চাইলে সে তার ‘নিয়োজিত’ ওয়ালী বা ওয়াকীলের মাধ্যমেও বিবাহ করতে পারবে – যা ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এখানে উল্লেখ্য যে, একটি ছেলে বা একটি মেয়ে ঠিক কখন বালেগ বা বিবাহের উপযুক্ত হয় সে সম্পর্কে কোরআন মজীদে কোনো সুনির্দিষ্ট বয়স বা সুনির্দিষ্ট শারীরিক নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয় নি। তবে এ বিষয়ে ইজমা‘এ উম্মাহ্ রয়েছে যে, ন্যূনকল্পে একটি ছেলে বা একটি মেয়ে যখন শারীরিকভাবে সন্তান জন্মদান ও সন্তান ধারণের উপযুক্ত হয় অথবা তার এ ধরনের উপযুক্ততার লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও যখন তার বয়স পনর বছর পূর্ণ হয় তখন অবশ্যই সে বালেগ হিসেবে গণ্য হবে। অবশ্য কোনো কোনো ফিক্বায় মেয়েদের ক্ষেত্রে বালেগ হওয়ার শারীরিক নিদর্শন প্রকাশ না পেলেও তথা তার ঋতুস্রাব না হলেও ন্যূনতম নয় বছর বয়স হওয়াকে বালেগ হওয়ার বয়স বলে গণ্য করা হয়েছে।
এবার আমরা কোরআন মজীদ থেকে এ ব্যাপারে দিকনির্দেশ গ্রহণের চেষ্টা করবো।
কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে কোনো বিশেষ শারীরিক নিদর্শন বা কোনো সুনির্দিষ্ট বয়স যদি বয়ঃপ্রাপ্তির তথা বিবাহের উপযুক্ততার মানদণ্ড হতো তাহলে সুস্পষ্ট ভাষায় তা উল্লেখ করায় কোনো সমস্যা ছিলো না; বয়স উল্লেখ করার ক্ষেত্রে তো কোনো সমস্যা হবার কথাই নয়, এমনকি বিধান যেহেতু মানুষের প্রয়োজনে সেহেতু শারীরিক নিদর্শন মানদণ্ড হলে তা উল্লেখের ক্ষেত্রেও সমস্যা ছিলো না। বিশেষ করে কোরআন মজীদে যখন নারীদের “হায়য্” (ঋতুস্রাব)-এর কথা ও এতদসংক্রান্ত আহকাম্ এবং নারী-পুরুষের যৌন সংসর্গের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং ফক্বীহগণ যখন পনর বছর বয়স হয় নি এমন ছেলে-মেয়েদের বালেগ হওয়ার নিদর্শন হিসেবে ছেলেদের ক্ষেত্রে মোচ বা যৌন কেশ উদ্গম বা স্বপ্নদোষ হওয়ার কথা এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে যৌন কেশ উদ্গম বা হায়য্ হওয়ার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ্ তা‘আলা এটাই উল্লেখ করতে পারতেন।
তাহলে কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে একটি ছেলে বা একটি মেয়ের বালেগ হওয়ার নিদর্শন কী?
কোরআন মজীদে ইয়াতীমদের অভিভাবকদের প্রতি তাদের কাছে তাদের ধনসম্পদ বুঝিয়ে দেয়ার জন্য তাদের বিবাহের উপযুক্ত হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে :
وَابْتَلُوا الْيَتَامَى حَتَّى إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ
“আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে বিবাহের উপযুক্ত হওয়া পর্যন্ত (বিবাহের উপযুক্ততার ব্যাপারে) পরীক্ষা করো, অতঃপর তোমরা যদি তাদের মধ্যে (বিচারবুদ্ধির) বিকাশ আঁচ করতে পার তাহলে তাদের ধনসম্পদ তাদের কাছে প্রত্যর্পণ কর।” (সূরাহ্ আন্-নিসা’ : ৬)
এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা ছেলে-মেয়েদের বিবাহের উপযুক্ততার ব্যাপারে তাদেরকে পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এটা সুস্পষ্ট যে, এখানে পরীক্ষা করা মানে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করা নয়। কারণ, একটি ছেলের মোচ গজিয়েছে কিনা তা বাইরে থেকে লক্ষ্য করা গেলেও অন্য কোনো নিদর্শন বাইরে থেকে অন্য লোকদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কারো জন্য একটি ছেলেকে তার স্বপ্নদোষ হয়েছে কিনা বা যৌন কেশ উদ্গম হয়েছে কিনা বা একটি মেয়েকে তার হায়য্ হয়েছে কিনা বা যৌন কেশ উদ্গম হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করা এবং হ্যা-বাচক জবাব দিলে তা দেখিয়ে প্রমাণ করতে বলা জায়েয নয়, কারণ, তা নির্লজ্জতা।
সুতরাং সর্বজনীন সুস্থ বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী নিঃসন্দেহে উক্ত আয়াতের দৃষ্টিতে বিবাহের উপযুক্ততা বা বয়ঃপ্রাপ্তির মানে একটি ছেলে বা একটি মেয়ের নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণার অধিকারী হওয়া – যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই সে এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মানসিকভাবে আগ্রহী হয়, যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষতঃ উল্লিখিত কোনো শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে সে আগ্রহ তীব্র হয় না।
বস্তুতঃ এটা অনস্বীকার্য যে, মানসন্তানের নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণার অধিকারী হওয়া তার মধ্যে বিচারবুদ্ধির বিকাশের একটি বিশেষ স্তর নির্দেশ করে যখন মানবসন্তান তার ধনসম্পদে স্বীয় মালিকানা ও স্বার্থ সম্পর্কেও জ্ঞানের অধিকারী হয়। তেমনি এ-ও অনস্বীকার্য যে, মানবসন্তানের মধ্যে বয়ঃপ্রাপ্তির শারীরিক নিদর্শন প্রকাশ পাওয়ার দু’-এক বছর আগেই এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশী আগেই সে নর-নারীর যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে জ্ঞানের অধিকারী হয় এবং তার মধ্যে এ ব্যাপারে ঔৎসুক্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। অতএব, কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে এটাই বালেগ হওয়ার তথা বিবাহের উপযুক্ততার বয়স।
কোরআন মজীদে ত্বালাক্বপ্রাপ্তা নারীদের জন্য ‘ইদ্দত পালনকে অপরিহার্য করার বিধান দেয়ার কারণ হিসেবে তারা গর্ভবতী কিনা এটা নিশ্চিত করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে :
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلاثَةَ قُرُوءٍ وَلا يَحِلُّ لَهُنَّ أَنْ يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِنْ كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ
“আর ত্বালাক্বপ্রাপ্তা নারীরা তাদের নিজেদেরকে তিন হায়য্-মুক্ত কালের (ثَلاثَةَ قُرُوءٍ) জন্য নিজেদেরকে (অন্যত্র বিবাহ করা হতে) বিরত রাখবে এবং আল্লাহ্ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন করা তাদের জন্য হালাল্ (জায়েয) নয়, যদি তারা আল্লাহ্ ও আখেরাতের দিনে ঈমান্দার হয়ে থাকে। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২২৮)
অন্যদিকে যে নারীকে তার স্বামী স্পর্শ করার অর্থাৎ তার সাথে যৌন সংসর্গ করার আগে তালাক্ব দিয়েছে তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা ‘ইদ্দত্ পালনের আদেশ দেন নি। এরশাদ হয়েছে :
وَإِنْ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيضَةً فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ إِلا أَنْ يَعْفُونَ أَوْ يَعْفُوَ الَّذِي بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ
“আর তোমরা যদি তাদেরকে (স্ত্রীদেরকে) স্পর্শ করার আগে ত্বালাক্ব দাও এবং তার আগেই তাদের জন্য নির্ধারণীয় (দেনমোহর) নির্ধারণ করে থাকো তাহলে তোমরা যা নির্ধারণ করেছো তার অর্ধেক (প্রদান করা অপরিহার্য) যদি না তারা (সে অর্ধেক) মাফ করে দেয় অথবা যার হাতে বিবাহ সে (স্বামী) (বাকী অর্ধেক) মাফ করে দেয় (তথা পুরো দেনমোহর প্রদান করে অথবা পুরো দেনমোহর পরিশোধ করে থাকলে প্রাপ্য অর্ধেক ফেরত না নেয়)। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২৩৭)
তালাক্বপ্রাপ্তা স্ত্রী তালাক্বদাতা স্বামীর কাছ থেকে ‘ইদ্দত্ পালনকালে অন্ন-বস্ত্র ও বাসস্থান লাভ করবে এ ব্যাপারে মতপার্থক্য নেই। সে স্বামীর সাথে যে গৃহে বা কক্ষে বসবাস করতো সেখানে থেকে ‘ইদ্দত্ পালন করবে এবং তাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করা যাবে না (সূরাহ্ আত্ব-ত্বালাক্ব : ১)। আর যেহেতু যে স্ত্রীর আর হায়য্ হওয়ার আশা নেই ও যে স্ত্রীর এখনো হায়য্ হয় নি, তেমনি যে স্ত্রী গর্ভবতী তাকে ত্বালাক্ব দেয়া হলে (সূরাহ্ আত্ব-ত্বালাক্ব : ৪) তা হবে ফেরত-অযোগ্য চূড়ান্ত ত্বালাক্ব সেহেতু তাদেরকে তাদের ঘর বা কক্ষ হতে বের করে দিতে নিষেধ করার পরিবর্তে তাদের জন্য সমমানের আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু যে স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগে ত্বালাক্ব দেয়া হবে তার জন্য শুধু নির্ধরিত দেনমোহরের অর্ধেক দিতে বলা হয়েছে; তাকে অন্ন-বস্ত্র বাসস্থান দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় নি। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, তাকে ইদ্দত্ পালন করতে হবে না। যেহেতু ‘ইদ্দত্ পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সে গর্ভবতী হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সেহেতু তাকে ‘ইদ্দত্ পালনের নির্দেশ দেয়ার কোনো কারণ নেই।
অথচ যে তালাক্বপ্রাপ্তা স্ত্রীর হায়য্ হওয়ার আশা নেই এবং যে তালাক্বপ্রাপ্তা স্ত্রীর এখনো হায়য্ হয় নি তাদের জন্য তিন মাস ‘ইদ্দত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে (সূরাহ্ আত্ব-ত্বালাক্ব : ৪)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, যে স্ত্রীর এখনো হায়য্ হয় নি তার সাথে স্বামীর যৌন সংসর্গ হয়, নচেৎ স্বামী তাকে স্পর্শ না করে থাকলে অর্থাৎ তার সাথে যৌন সংসর্গ না করে থাকলে তাকে ‘ইদ্দত্ পালন করতে হতো না।
এ আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয় যে, কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে একটি মেয়ে হায়য্ হওয়ার তথা বয়ঃপ্রাপ্তির শারীরিক নিদর্শন প্রকাশ পাওয়ার আগেই কেবল বিচারবুদ্ধির যথাযথ বিকাশ হলেই বিবাহের উপযুক্ত বা বালেগ হয়। ফলে ছেলেদের ক্ষেত্রেও, বয়ঃপ্রাপ্তির শারীরিক নিদর্শন প্রকাশ না পেলেও কেবল বিচারবুদ্ধির যথাযথ বিকাশ হলেই তাকে বিবাহের উপযুক্ত বা বালেগ বলে গণ্য করতে হবে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যে স্ত্রীর এখনো হায়য্ হয় নি তার তো গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে তাকে কেন ‘ইদ্দত্ পালনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে?
এ ব্যাপারে আলাচনার জন্য প্রথমে আমরা সংশ্লিষ্ট আয়াতটির প্রতি দৃষ্টি দেবো। এরশাদ হয়েছে :
وَاللائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللائِي لَمْ يَحِضْنَ وَأُولاتُ الأحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَة
“আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা হায়য্ হওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়েছে (যাদের হায়য্ হওয়ার সম্ভাবনা নেই) তাদের ব্যাপারে তোমাদের যদি সন্দেহ হয় তো তাদের ‘ইদ্দত্ তিন মাস এবং যারা এখনো ঋতুবতী হয় নি তাদেরও (তিন মাস)। আর গর্ভবতীদের মেয়াদ প্রসব করা পর্যন্ত। ” (সূরাহ্ আত্ব-ত্বালাক্ব : ৪)
এখানে বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখার বিষয় আছে। তা হচ্ছে, যাদের হায়য্ হওয়ার আশা নেই তাদের ব্যাপারে সন্দেহ হলে তাদেরকে তিন মাস ‘ইদ্দত্ পালন করতে হবে। এ থেকে যে উপসংহার নিষ্পন্ন হয় তা হচ্ছে, কোনো নারীর হায়য্ বন্ধ হয়ে গেলেই সাথে সাথে তার যৌন সংসর্গের আগ্রহ ও ক্ষমতা লোপ পায় না এবং এমতাবস্থায় যৌন সংসর্গের ফলে তার গর্ভবতী হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। কারণ, ভ্রূণের সূচনা হয় ডিম্ব ও শুক্র কীটের মিলনের ফলে। যদিও সাধারণতঃ নারীদের ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর তাদের গর্ভাশয়ে ডিম্ব তৈরী হয় এবং ঋতুস্রাবের পরই গর্ভবতী হবার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু ব্যতিক্রমও হতে পারে। অর্থাৎ এমনও হতে পারে যে, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাবার পরেও তার গর্ভাশয়ে ডিম্ব তৈরী হতে পারে এবং এ অবস্থায় সে যৌন সংসর্গ থেকে গর্ভবতী হতে পারে।
হযরত ইসহাক্ব্ (‘আঃ)-এর যখন জন্ম হয় তখন হযরত ইবরাহীম্ (‘আঃ) ও হযরত সারাহ্ (‘আঃ) উভয়ই বৃদ্ধ ছিলেন এবং হযরত সারাহ্ (‘আঃ) বন্ধ্যা ছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁদের সন্তান হওয়া যে তাঁদের প্রতি আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ ছিলো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা তো চাইলে তাঁদের যৌবন বয়সেই তাঁদের প্রতি এ অনুগ্রহ করতে পারতেন। তাহলে তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে কেন? এ থেকে বুঝা যায় যে, মানুষের বৃদ্ধ বয়সেও – যখন আর তাদের সন্তান ধারণের ও সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নেই বলে মনে করা হয়, তখনও নারী-পুরুষের সন্তান হতে পারে।
ব্যতিক্রম হলেও এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত আছে। আমার জানা তথ্যাদির মধ্যে আছে : একজন নারীর প্রতি মাসে হায়য্ হতো না, বরং দু’তিন বছর পর পর হায়য্ হতো এবং হায়য্ থেকে পাক হওয়ার হওয়ার পর পরই স্বামীসংসর্গ থেকে তিনি গর্ভবতী হতেন। তেমনি একজন নারীর জীবনে এক বারই হায়য্ হয় এবং তিনি এক বারই গর্ভবতী হন। তেমনি হায়য্ বন্ধ হয়ে যাবার পরও গর্ভবতী হবার ঘটনাও জানা আছে। তেমনি যে যুগে জন্মনিয়ন্ত্রণ ছিলো না সে যুগে কয়েক সন্তান জন্ম নেয়ার পরে বৃদ্ধা মহিলা পুনরায় সন্তান জন্মদান করেন – যখন তাঁর পূর্ববর্তী কনিষ্ঠতম সন্তানের বয়স ছিলো ১৪ বছর।
সুতরাং, একইভাবে ব্যতিক্রম হিসেবে এমনটা হওয়া অসম্ভব নয় যে, একটি মেয়ের গর্ভাশয়ে ডিম্ব তৈরী হয়েছে, কিন্তু তখনো তার হায়য্ হয় নি। এমতাবস্থায় যৌন সংসর্গ থেকে সে গর্ভবতী হয়ে থাকতে পারে।সুতরাং ত্বালাক্বের ক্ষেত্রে – তেমনি স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও – তার জন্য ‘ইদ্দত্ পালন করা অপরিহার্য। অনুসন্ধান চালালে হয়তো এ ধরনের ঘটনা পাওয়া যেতে পারে যে ক্ষেত্রে হায়য্ হওয়ার আগেই যৌন সংসর্গ থেকে একটি মেয়ে গর্ভবতী হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সব কম বয়সী মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছে তাদের মধ্যে এমনকি বয়স আট বছর বয়সী মেয়েও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে খুবই সম্ভাবনা যে, বিচারবুদ্ধির যথাযথ বিকাশ হওয়ার ফলে মেয়েটি নর-নারীর যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণার এবং ঔৎসুক্য ও আগ্রহের অধিকারী হয়, সেহতু সে এ আগ্রহ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে বন্ধুর সাথে যৌন সংসর্গে মিলিত হয়, কিন্তু তার হায়য্ হয় নি বিধায় গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে কোনো ব্যবস্থা নেয় নি, অথচ তার গর্ভাশয়ে ইতিমধ্যেই ডিম্ব তৈরী হয়ে গিয়েছিলো বিধায় সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমে সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে।
অনুরূপভাবে বিচারবুদ্ধির যথাযথ বিকাশ হওয়ার ফলে নর-নারীর যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণার এবং ঔৎসুক্য ও আগ্রহের অধিকারী একটি ছেলের ক্ষেত্রেও এ সম্ভাবনা আছে যে, তার মধ্যে হয়তো সন্তান জন্মদান ক্ষমতা তৈরী হয়েছে কিন্তু সে নিজেই তা জানে না। এমতাবস্থায় সে কোনো নারীর সাথে যৌন সংসর্গ করলে তার ফলে ঐ নারী গর্ভবতী হয়ে যেতে পারে।
মোদ্দা কথা, কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে একটি ছেলের বা একটি মেয়ের বিবাহের উপযুক্ততা বা বালেগ হওয়ার নিদর্শন বয়প্রাপ্তির শারীরিক নিদর্শন নয়, বরং যখন সে বিচারবুদ্ধির বিকাশের এমন এক স্তরে উপনীত হয় যার ফলে সে নর-নারীর যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণার অধিকারী হয়। আর এর ফলে সে এ ব্যাপারে ঔৎসুক্যের কারণে এর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আগ্রহের অধিকারী হবে এবং উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ পেলে তা চরিতার্থ করবে – এটাই স্বাভাবিক। বাস্তবতাও এটাই নির্দেশ করে।
এবার আমরা এতদসংক্রান্ত কিছু বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি দেবো।
বয়ঃপ্রাপ্তির বয়স : বাস্তবতার আলোকে
জাতিসংঘ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বিবাহের জন্য ন্যূনতম বয়স বেঁধে দিয়েছে। বাংলাদেশেও একটি ছেলের জন্য ২১ বছর ও একটি মেয়ের জন্য ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে বিবাহ করার অনুমতি নেই। এর চেয়ে কম বয়সী ছেলে বা মেয়ের বিবাহ হলে যারা এ ধরনের বিবাহ পড়াবে, এতে সাক্ষী থাকবে ও নিবন্ধনকারী ক্বাযী এবং মেয়েটির ক্ষেত্রে তার অভিভবক বিবাহ দিলে সে – এদের সকলেই শাস্তিযোগ্য অপরাধী সাব্যস্ত হবে। অবশ্য বিবাহ আইনের সংশোধনী অনুযায়ী, একটি মেয়ের বয়স যদি ১৬ বছর হয় এবং তার অভিভাবক মেয়েটির কল্যাণের স্বার্থে তাকে বিবাহ দিতে চায় তো বিচারকের অনুমতি নিয়ে তাকে বিবাহ দিতে পারবে। কিন্তু ছেলেদের জন্য এ ধরনের সুযাগ তৈরী করা হয় নি।
তবে আইনে উল্লেখ না থাকলেও আইনানুযায়ী যাদের বিবাহের বয়স হয় নি তারা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, কেবল জবরদস্তি করলে অর্থাৎ ধর্ষণ করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। আর অনেক ছেলেমেয়ে বিবাহের মাধ্যমে বৈধ পন্থায় যৌন প্রয়োজন পূরণ করতে না পেরে যৌন তাড়নায় বাধ্য হয়েই এ সুযোগ গ্রহণ করছে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অবাধ সহজলভ্যতার এ যুগে এ ক্ষেত্রে পরস্পর সম্মত থাকলে কোনো কিছুই তাদের জন্য বাধা হচ্ছে না। অন্যদিকে অনেকে সে সুযোগ না পাওয়ায় বা পেলেও কোনো না কোনোভাবে ঘটনা ফাশ হয়ে গেলে সমাজে নিন্দিত হওয়ার ভয়ে দুই ছেলে-বন্ধু পরস্পরের সহায়তায় বা দুই মেয়ে-বন্ধু পরস্পরের সহায়তায় অথবা নিজে নিজেই প্রকৃতিবিরুদ্ধে পন্থায় প্রয়োজন পূরণ করে স্বীয় স্বাস্থ্য ও যৌনক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আমরা ওপরের আলোচনায় কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে বালেগ হওয়ার তথা বিবাহের উপযুক্ততার মানদণ্ড অকাট্যভাবে তুলে ধরেছি। কিন্তু আমরা এমন মুসলমান যে, কোনো কিছু কোরআন বলেছে কেবল এতোটুকুতেই সন্তুষ্ট হতে পারি না। তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখানে অত্যন্ত সংক্ষেপে বাস্তবতা সম্বন্ধে কিছুটা আভাস দিচ্ছি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমবয়সী মেয়েদের দ্বারা সন্তান জন্মদানের ঘটনা অনেক। এগুলোর মধ্যে রয়েছে : বুলগেরিয়ার কর্তেজা জেলিয়েজকোভা কর্তৃক ১০ বছর পার হয়ে ১১ বছরে পা দিয়েই সন্তান প্রসব (পিপলস ডেইলি : ২রা নভেম্বর ২০০৯ > ইত্তেফাক) এবং মেক্সিকোর দাফনে কর্তৃক আট বছর পার হয়ে নয় বছরে পা দিয়েই সন্তান প্রসব (এএফপি/ আমার দেশ : ৭ই ফেব্রুয়ারী ২০১৩)। এছাড়া উইকিপেডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এগারো বছরের কম বয়সী শতাধিক মাতার সন্তান জন্মদানের তথ্যসূত্র সহ বিস্তারিত তথ্য বিবাহের সুযোগ লাভের জন্য ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে দেয়ার আইনের অবাস্তবতাই প্রমাণ করে, বরং এ আইন কম বয়সী বয়ঃপ্রাপ্ত ছেলে-মেয়েদেরকে ব্যভিচারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।
এবার আমাদের দেশের বাস্তবতা।
Nan Li, Marc Boulay পরিচালিত একটি জরীপের প্রতিবেদন অনুযায়ী – যা Predictors of premarital sex among Bangladesh male adolescents শিরোনামে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়েছে – বাংলাদেশের ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেদের মধ্যে ১২.৮% ভাগ বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতার অধিকারী। তবে Bangladesh Demographic and Health Survey 2004 অনুযায়ী এ হার আরো বেশী – ১৩.৪% ভাগ। অবশ্য Nan Li, Marc Boulay পরিচালিত জরীপে ১০ বছরের বেশী ও ১৫ বছরের কম বয়সী ছেলেদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কিন্তু তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতার অধিকারীদের সংখ্যা খুবই কম বিধায় প্রতিবেদন থেকে তার ফলাফল বাদ দেয়া হয়। তবে এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, পনর বছরের কম বয়সী অনেক ছেলেরও এ ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু ১০ বছরের বেশী ও ১৫ বছরের কম বয়সী ছেলেদের মধ্যে যৌন অভিজ্ঞতার অধিকারীদের সংখ্যা কম হলেও তা যদি যথাক্রমে শতকরা ১ থেকে ৫ ভাগও হয়ে থাকে তো তা-ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করলে ভালো হতো।
অন্যদিকে, সম্ভবতঃ বাংলাদেশী বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনের কারণে যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতার অধিকারী মেয়েদের অনেকেই স্বীয় যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার তথ্য সরবরাহ করবে না ধরে নেয়ার কারণে মেয়েদের ওপরে জরীপ চালানো হয় নি। কিন্তু যেহেতু মেয়েদের গড়পরতা বয়ঃপ্রাপ্তি ছেলেদের তুলনায় আগে হয়ে থাকে এবং বয়সের উল্লিখিত স্তরে যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সাধারণতঃ সমবয়সী বা প্রায় সমবয়সী ছেলে-মেয়ের মধ্যে হয়ে থাকে সেহেতু আমরা ধরে নিতে পারি যে, ঐ বয়সের মেয়েদের যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতার হার একই বয়সের ছেলেদের হারের চেয়ে কম নয়।
দেশে যে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কমপক্ষে শতকরা ১৩ ভাগ ছেলে-মেয়ে বিবাহবহির্ভূত যৌন সংসর্গের অভিজ্ঞতার অধিকারী হচ্ছে তা-ই প্রমাণ করে যে, আমাদের দেশে সামাজিক বিপর্যয় ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
এবার বিবাহের বয়স সংশ্লিষ্ট আরেকটি বাস্তবতা।
একটি ছোট্ট সংবাদের শিরোনাম ‘হাতির ঝিলে স্কুলছাত্রের আত্মহত্যা’। কিন্তু কেন এ আত্মহত্যা?
সংবাদের বিবরণ সংক্ষেপে : ঢাকার হাতির ঝিলের ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে এহসানুল হক তন্ময় (১৬) নামের এক স্কুলছাত্র। একই সঙ্গে তার সহপাঠী কিশোরী মীম-ও ঝাঁপ দিয়েছিলো। তবে সে বেঁচে গিয়েছে।
দু’জনই ঢাকার মগবাজারের প্রভাতী উচ্চ বিদ্যানিকেতনের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বাড্ডা থানার ওসি-র বক্তব্য অনুযায়ী, ওদের দু’জনের মধ্যে প্রেম ছিলো। কয়েক মাস আগে মেয়েটির পরিবার তার বিবাহ ঠিক করায় তারা এ ঘটনা ঘটায়।
(দৈনিক আমার দেশ, অনলাইন্ সংস্করণ : ৩রা জানুয়ারী ২০১৪)
অবশ্য ওপরের সংবাদে মেয়েটির বয়স উল্লেখ করা হয় নি, তবে সে-ও দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলো বিধায় ধরে নেয়া যেতে পারে যে, ঐ সময় তার বয়স বিবাহের জন্য আইন কর্তৃক নির্ধারিত বয়স ১৮ বছরের নীচে ছিলো। আর যদিও সে ঘটনাক্রমে বেঁচে যায়, তবে সে-ও তো প্রেমের কারণে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো।
এছাড়া এখানে একই প্রসঙ্গে কয়েকটি সংবাদসংক্ষেপের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই : ১৪ বছরের মেয়ে ও ১৬ বছরের ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ও বিবাহ করতে না দেয়ায় প্রেমিকের আত্মহত্যার জন্য বিষপান (নিউজমিডিয়াবিডি.কম : ১৮ই এপ্রিল ২০১২)। বিবাহ করলে পরিবার তা মেনে নেবে না বিধায় হতাশ প্রেমিক (২০) ও প্রেমিকার (১৬) গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা (দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক : ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৩; দৈনিক আমার দেশ : ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৩)। পরিবার সম্পর্ক মেনে না নেয়ায় ২৪ বছরের প্রেমিক ও ১৪ বছরের প্রেমিকার একই রশিতে ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা (দৈনিক আমার দেশ : ৪ঠা ডিসেম্বর ২০১২)। ২০ বছরের প্রেমিক ও ১৬ বছরের প্রেমিকার আত্মহত্যা (আরটিএনএন : ২৮শে অক্টোবর ২০১৩)।
এখানে দেখা যাচ্ছে, আত্মহত্যার পদক্ষেপ গ্রহনকারী চারটি জুটির আটজনের মধ্যে পাঁচজনের বয়সই ১৮ বছরের নীচে। এটা কি প্রাকৃতিকভাবে তাদের প্রেম ও বিবাহের উপযুক্ততা প্রমাণ করে, নাকি করে না? তাহলে কেন আইন, সমাজ ও পরিবার তাদেরকে আত্মহত্যার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করলো?
বস্তুতঃ বয়ঃপ্রাপ্তির শারীরিক নিদর্শন প্রকাশ পাক বা না পাক, যে ছেলেটি বা মেয়েটি নর-নারীর যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে জ্ঞানের অধিকারী ও এ ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আগ্রহী তাকে বিবাহ করতে দেয়া না হলে বা বিবাহ করতে দিলেও স্বীয় জুটির সাথে একত্রবাসে আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও তাকে সে সুযোগ দেয়া না হলে তার অবৈধ যৌন সংসর্গে জড়িত হয়ে পড়ার খুবই আশঙ্কা থাকে। কারণ, পনর বছরের কম বয়সী যারা স্বেচ্ছাকৃত যৌন সংসর্গের অভিজ্ঞতার অধিকারী নিঃসন্দেহে তাদের একটি অংশ এমন যাদের মধ্যে বয়ঃপ্রাপ্তির শারীরিক নিদর্শন প্রকাশ পায় নি, কিন্তু মানসিক দিক থেকে তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে।
সুতরাং বিবাহ আইনের সংশোধন করে মানসিক বিকাশের বিচারে যারাই বয়ঃপ্রাপ্ত তাদের যে কেউ স্থায়ী বা অস্থায়ী বিবাহ করতে চাইলে তাকে অবশ্যই বিবাহ করার অধিকার ও সুযোগ দেয়া উচিত। আমি বলছি না যে, তাদেরকে অবশ্যই বিবাহ দিতে হবে। কারণ, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেসে জোর করে বা চাপে ফেলে কারো বিবাহ দেয়া হলে ইসলামের দৃষ্টিতে তা বিবাহ হিসেবে গণ্য নয়।
এ প্রসঙ্গে তথাকথিত বাল্য বিবাহের বিরোধীরা বিভিন্ন ধরনের আপত্তি তুলবেন এটাই স্বাভাবিক। এ সব আপত্তির জবাব ইতিপূর্বেও দিয়েছি। এখানে কেবল সংক্ষেপে এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করি যে, বিবাহের পর এ ধরনের দম্পতির প্রত্যেকে নিজ নিজ অভিভাবকের গৃহে থেকেই আগের মতোই পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে এবং মাঝে মাঝে পরস্পরের বাড়ীতে মেহমান হয়ে একত্রে রাত্রিযাপন করতে ও বন্ধুর মতো একত্রে চলাফেরা করতে পারে। আর বর্তমান যুগে সন্তান গ্রহণ স্থহিত রাখা কোনো সমস্যাই নয়। অতঃপর তারা উপযুক্ত সময়ে আলাদা সংসার করতে পারবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যগত প্রশ্নও অবান্তর। কারণ, তাদের অনেকে যা অবৈধভাবে করছে সে কাজটিই তারা সামাজিকভাবে জুটিবদ্ধ হয়ে করবে; অন্য কিছু নয়।
এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। তা হচ্ছে, আমরা দেখি যে, কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা সাধারণতঃ বিবাহের প্রযোজন অনুভব করা সত্ত্বেও সরাসরি বা তৃতীয় কারো মাধ্যমে অভিভাবকের কাছে তা বলে না, অথচ তাদের অনেকেই প্রাকৃতিক বা প্রকৃতিবিরুদ্ধ অবৈধ পন্থায় স্বীয় যৌন প্রয়োজন পূরণ করছে।
এভাবে তাদের বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ না করার কারণ আমাদের সমাজ যৌনতাকে ট্যাবুতে পরিণত করেছে এবং কদাচিৎ কম বয়সী কোনো ছেলে বা মেয়ে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে হাসি-ঠাট্টা ও নিন্দার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অতীতে এ সমস্যা খুবই কম ছিলো, কারণ, তখন অভিভাবকরাই ছেলে-মেয়েদেরকে কম বয়সে বিবাহ দিতেন এবং কেউ এ ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে হাসি-ঠাট্টা ও নিন্দার সম্মুখীন হতে হতো না। কিন্তু আমরা যতো বেশী শিক্ষিত ও তথাকথিত আধুনিক হচ্ছি ততো বেশী কতক ব্যাপারে পশ্চাদ্গামী হচ্ছি।
আমাদের মানসিকতা যেন এই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ছেলে-মেয়েরা বাবা-মা’র অজ্ঞাতসারে প্রাকৃতিক বা প্রকৃতিবিরুদ্ধ অবৈধ পন্থায় স্বীয় যৌন প্রয়োজন পূরণ করে স্বীয় ভবিষ্যত বিনষ্ট করলে তাতে আপত্তি নেই, কেবল মুখে বিবাহের কথা বললেই আপত্তি।
ত্ইা এ ব্যাপারে সমাজ-মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া এবং আইনপ্রণেতাদেরকে প্রকৃত বাস্তবতার আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সচেতন করে দেয়া অপরিহার্য।
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :
افحکم الجاهلية يبغون. و من احسن من الله حکماً لقوم يقنون.
“তাহলে কি তারা অজ্ঞতাজনিত ফয়ছালাহর সন্ধান করছে? বস্তুতঃ ফয়ছালাহ্ প্রদানের প্রশ্নে ইয়াক্বীনের অধিকারীদের কাছে আল্লাহর চেয়ে উত্তম কে হতে পারে?” (সূরাহ্ আল্-মাএদাহ্ : ৫০)
তাই ভেবে দেখা দরকার আমরা কোন্ পথে অগ্রসর হবো – যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার শারীরিক-মানসিক সকল প্রয়োজন সম্পর্কে অবগত তাঁর ফয়ছালাহ্ মানবো, নাকি যারা এ ব্যাপারে অজ্ঞ তাদের ফয়ছালাহ্ মেনে চলবো?
পুনশ্চ :
দেশের উত্তরাঞ্চলীয় কোনো এক গ্রমের একটি ঘটনা নির্ভরযোগ্য সূত্রে শুনেছি।
বাবা তার ১৮ বছরের ছেলের বিবাহ দিলে তার কোনো প্রতিবেশী বিষয়টি থানায় জানিয়ে দেয়। থানা থেকে ওসি সাহেব এসে বাবাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বাবা বলেন : “দেখুন ওসি সাহেব, ছেলে সাবালক হয়েছে, তাই তাকে বিবাহ দিয়েছি বলে আপনি আমাকে হাতকড়া পরাতে এসেছেন। কিন্তু বিবাহ না করালে ছেলে যদি কারো মেয়েকে টেনে নিয়ে যেতো তাহলে তো আপনি বাপ-বেটা দু’জনকেই হাতকড়া পরাতেন।” এ কথা শুনে ওসি সাহেব কিছু না বলে চলে যান।
লিখেছেনঃ নূর হোসেন মজিদী।
বিবাহের বয়স : কোরআন মজীদ ও বাস্তবতা বিবাহের বয়স : কোরআন মজীদ ও বাস্তবতা Reviewed by বায়ান্ন on April 09, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.