নিজে আগে ভালো হই

ঘটনাটা একটু অন্যরকম। একবার এক নারী তার স্বামীকে বলল তাদের বাড়ির খুব নিকট দাঁড়িয়ে থাকা গাছটি কেটে ফেলতে। স্বামী বেচারা গাছ কাটার কারণ জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী বলে; আমার গোসলের সময় গাছটিতে কিছু পাখিদের আনাগোনা হয় যেটা আমার কাছে বরই লজ্জার ও বিব্রতকর। আমি চাইনা আমার গোসলের সময় কোন পাখি আমাকে দেখুক। স্ত্রীর কথা শুনে স্বামী তো বড্ড খুশী, চটজলদি লোক আনিয়ে গাছটি কেটে ফেললেন। এর কিছুদিন পরের কথা। স্বামী লোকটি একদিন হঠাৎ বাসায় ফিরে দেখতে পান তার স্ত্রী অপরিচিত এক লোকের সাথে খুব আয়েশি ভাবে এবং ভীষণ আন্তরিকতার সাথে কথা বলছে। হাসিঠাট্টা করছে। যেন ওই অপরিচিত লোকটি তার কত আপন। এই দৃশ্য দেখে স্বামী বেচারা খুব দুঃখ পায়। আপন স্ত্রী যেন আজ তার কাছে ভীষণ অচেনা। রাগে ক্ষোভে সে নিজ ভূমি ছেড়ে বাগদাদ চলে যায়। সেখানে গিয়ে ব্যাবসা বানিজ্য শুরু করে। আল্লাহ তা’আলা তার ব্যাবসায় ভরপুর কামিয়াবি দান করেন। বাগদাদের বড় বড় প্রভাবশালী ব্যাবসায়ীদের সাথে তার নামও নেয়া হতে থাকে। এভাবে আস্তে আস্তে সে বাগদাদের কোতোয়ালের সন্তুষ্টি অর্জন করে ফেলে। ফলে সে কোতোয়ালের নিকট যাতায়াত শুরু করে। হঠাৎই একদিন কোতোয়ালের বাসায় চুরি হয়। আইন শৃংখলা বাহিনী বহু চেষ্টা করেও চোর ধরতে সক্ষম হচ্ছিলো না। এদিকে ওই কোতোয়ালের বাসায় বড় আবাকাবা পরিহিত একজন শায়খ মাঝেমধ্যেই আসা যাওয়া করতেন। কোতোয়াল তাকে ভীষণ ভক্তি শ্রদ্ধা করেন। মহিলার স্বামী বিষয়টা লক্ষ্য করে কিন্তু তার কাছে একটা জিনিস ভীষণ অবাক লাগে। সে লক্ষ্য করে ওই শায়খ পুরো পা মাটিতে ফেলে চলে না বরং আধা পা ফেলে চলাচল করে। তখন সে কাউকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে একজন বলে; শায়খ মাটিতে পুরো পা ফেলে চলাচল করেননা কারণ এতে সম্ভাবনা আছে কোন পোকা মাকড় পায়ের নিচে পড়বে এবং দলিত হয়ে মারা যাবে এইজন্য তিনি আধা পা ফেলে চলাচল করেন। এটা শুনে সে তাৎক্ষনিক কোতোয়ালের বাসায় গিয়ে কোতোয়ালকে ডেকে বলে, আপনার চোর পেয়ে গেছি। কোতোয়াল জিজ্ঞেস করে, কোথায় সেই চোর, নিয়ে এসো আমার কাছে। সে বলে, আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, আপনার ওই শায়খই আপনার বাসায় চুরি করেছে। কোতোয়াল তো হতবাক। তিনি তদন্তের জন্য ওই শায়খের ঘরে গিয়ে দেখেন চুরি যাওয়া সমস্ত মাল সামানা শায়খের ঘরেই রয়েছে। শায়খই চোর সাব্যস্ত হলো। কোতোয়াল এরপর তাকে জিজ্ঞেস করেন, ভাই! আমাদের তো বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলো না যে শায়খ চুরি করতে পারে, তুমি কিভাবে জানলে এই বিষয়? লোকটি উত্তর দেয়, কোতোয়াল সাহেব! আমার ঘরের সন্নিকটে থাকা একটি গাছ আমাকে এই পরামর্শ দিয়েছে যে, যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভালো সাজার চেষ্টা করে আসলে তারা ভালো নয়।

.

আজকালকার যুগে এই বিষয়টা খুব প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। আজ অনেকে এমন আছে যারা বাইরে বাইরে প্রচুর দ্বীনদারি দেখায় কিন্তু বাস্তবতা হলো খারাপ কাজের কারণে তার আত্মীয় স্বজনরা এমনকি তার পরিবারের লোকেরা পর্যন্ত তার নিকট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। তাদের বাহির থাকে সুন্দর পরিপাটি আর ভিতর থাকে কুৎসিত কদাকার। বাহিরে তারা দরবেশ আর ভিতরে ভিতরে ফিরাউন। বাহিরে পাক্কা মু’মিন আর ভিতরে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল। উপরে উপরে তারা মদীনাওলার প্রেমে হাবুডুবু খায় কিন্তু তারাই আবার কাফেরদের অনুসরণ এবং তাদের রীতিনীতিকে শ্রদ্ধার সাথে মেনে নেয়। তারা মানুষকে বিভিন্ন উপদেশ দিয়ে থাকে কিন্তু নিজেদের জীবনে এর প্রতিফলন দেখা যায়না। তারা মানুষকে ওয়াজ নসিহত করে থাকে কিন্তু নিজেরাই থাকে পাপাচারে লিপ্ত। এমন মানুষদের জন্যই আল্লাহ তা’আলা ঘোষনা করেন..

“মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বলো? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।” (সূরা আস-সাফ, আয়াত: ২,৩)

“তোমরা কি মানুষকে ভালো কাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেদের ক্ষেত্রে তা ভুলে যাও?” (সূরা বাকারা, ৪৪)

আপনি আপনার চারপাশে এমন বহু উপদেশদাতাকে দেখতে পাবেন যারা সবসময় মানুষদের কল্যাণের পথে আহবান করে, ভালো কাজের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে, অকল্যাণের পথ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেয়, অথচ দেখা যায় তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়ে আছে।

দুর্নীতিবাজদের দেখবেন, দুর্নীতি না করতে তারা বিভিন্ন সমাবেশ ও আলোচনার-টেবিলে মানুষদের উৎসাহিত করছে। সুদখোর-ঘুসখোররা ওসব থেকে বিরত থাকতে মানুষদের বুঝাচ্ছে, জালেম জুলুমের অপকারীতা বিভিন্ন সভা সংসদে তুলে ধরছে। পাপাচারীরা পাপের খারাপ দিকগুলি উন্মোচন করে সতর্ক করছে। অনলাইন অফলাইনে, পাড়া-মহল্লায়, সমাজের পরতে পরতে এমন কল্যাণকামীদের সরব উপস্থিতি পাওয়া যায় বটে কিন্তু তারা নিজেরাই অপরাধের সাগরে আমগ্ন ডুবে আছে, জড়িয়ে আছে অসংখ্য অন্যায় অপরাধে।

কত গর্হিত একটি কাজ। নিজের শরীরে ময়লা রেখে অপরকে পরিস্কারের ব্রত পালনে নিয়োজিত আছে, এর থেকে নিকৃষ্ট আর কি হতে পারে? কোন রুচিশীল ব্যাক্তি কি এ ধরণের কাজ করবে? অবশ্যই না।

আল্লাহ যেন সে কথাই বলছেন, ‘তোমরা কী মানুষদের ভালো কাজের নির্দেশ দাও আর নিজেদের ক্ষেত্রে তা ভুলে যাও? নিজেরা পাপাচারে লিপ্ত হয়ে আছো অথচ অন্যদের বলছো ভালো হয়ে যেতে? নিজেদের ক্ষেত্রে কোন খোঁজ খবর নেই কিন্তু অপরের কল্যাণের জন্য হণ্যে হয়ে ছুটছো?’

অর্থাৎ এখানে আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্য হচ্ছে কাউকে ভালো কাজের দিকে ডাকার পাশাপাশি নিজেকে আগে সে ভালোর আদলে গড়ে তোলা। আপনি অন্যকে ভালোর দিকে ডাকলেন অথচ নিজেই ভালো হলেননা, আপনি কাউকে কল্যাণের পথ দেখিয়ে দিলেন অথচ নিজেই অকল্যাণের চাদরে জড়িয়ে আছেন এই অপূরণীয় ক্ষতি যেন আপনার না হয়ে যায়, অন্যের সাথে সাথে নিজেও যেন কল্যাণের রাজপথে চলতে পারেন সেটাই আয়াতের মূল টার্গেট।

সুতরাং এমন জীবন পরিবর্তন করতে হবে। বাহির আর ভিতরের পরিচয় বানাতে হবে একটাই, মু’মিন মুত্তাকী।

নিজে আগে ভালো হই নিজে আগে ভালো হই Reviewed by বায়ান্ন on April 07, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.