ঈমান ও বিশ্বাস

বাংলা ভাষায় অনেকেই ইসলামী পরিভাষা আরবী “ঈমান্” (ايمان) শব্দের অনুবাদ করেন ‘বিশ্বাস’ এবং অনেকে শব্দটিকে অনুবাদ না করে “ঈমান্” লিখে থাকেন। প্রকৃত পক্ষে ‘বিশ্বাস’ হচ্ছে “ঈমান্” শব্দের ভুল অনুবাদ। সর্বপ্রথম যারা “ঈমান্” শব্দটিকে ‘বিশ্বাস’ হিসেবে অনুবাদ করেন তাঁরা এখানকার ভাষায় এ জন্য অন্য কোনো উপযুক্ত শব্দ না পাওয়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস পরিভাষা থেকে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি গ্রহণ করেন। কিন্তু ইসলামের মৌলিক উপস্থাপনাসমূহের ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাস’-এর কোনো স্থান নেই। আমরা আমাদের অত্র আলোচনায় এটাই প্রমাণ করবো।
‘বিশ্বাস’ শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে ‘ধারণা’, আরেকটি অর্থ হচ্ছে ‘আস্থা’। আমাদের আলোচনা শব্দটির প্রথমোক্ত অর্থে প্রয়োগ সম্বন্ধে, দ্বিতীয়োক্ত অর্থে প্রয়োগ সম্বন্ধে নয়। দ্বিতীয়োক্ত অর্থে এমন কারো বা কোনো কিছুর প্রতি বিশ্বাস (আস্থা) পোষণ করা হয় যার অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত জ্ঞান আছে, যেমন : আমরা চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের ওপর বিশ্বাস করি (আস্থা রাখি)।
কিন্তু প্রথমোক্ত অর্থে ‘বিশ্বাস’ শব্দ দ্বারা কারো বা কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও তা ‘আছে’ বলে ধরে নেয়া হয়। এ ধরনের ‘বিশ্বাস’ কার্যতঃ সঠিক হতেও পারে, না-ও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ঘরের সামনে গিয়ে আমরা সেটিকে ভিতর থেকে দরযাহ্ বন্ধ অবস্থায় দেখে ঘরটির ভিতরে লোক আছে বলে বিশ্বাস করি; এ বিশ্বাস সঠিক হতেও পারে না-ও হতে পারে। কারণ, হতে পারে যে, ঘরের ভিতরের লোকটি সামনের দরযাহ্ বন্ধ করে পিছনের খিড়কি দরযাহ্ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছে, অথবা কোনো কৌশলে ঘরের বাইরে থেকেই দরযাহর ভিতর দিককার খিল বন্ধ করে দিয়েছে। অনুরূপভাবে আমরা স্বচ্ছ তরল পদার্থ দেখে তাকে পানি মনে করতে পারি, কিন্তু তা পানি না হয়ে অন্য কোনো পদার্থও হতে পারে। তেমনি আমরা সুপেয় শরবত বিশ্বাসে বিষ মিশ্রিত শরবত পান করে মৃত্যুকে ডেকে আনতে পারি। মোদ্দা কথা, অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো কিছুর সত্যতায় উপনীত হওয়া ব্যতীতই তাকে সত্য বলে মেনে নেয়াই ‘বিশ্বাস’। আর এ ধরনের ‘বিশ্বাস’ই আমাদের আলোচ্য বিষয়।
শুরুতেই উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি যে, ইসলামের মৌলিক উপস্থাপনাসমূহ হচ্ছে : সৃষ্টিকর্তা আছেন ও তিনি এক (আরবী পরিভাষায় যার নাম “আল্লাহ্”), মৃত্যুর পরে মানুষকে পুনর্জীবিত করা হবে ও ভালো-মন্দ চিন্তা ও কর্মের ভিত্তিতে তাদেরকে শাস্তি ও পুরষ্কার দেয়া হবে এবং আল্লাহ্ মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য তাদের কাছে মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গকে স্বীয় বাণী সহ পাঠিয়েছেন – যাদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি হচ্ছেন “কোরআন” নামক গ্রন্থ নিয়ে আগমনকারী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)। এ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাস’ শব্দ ব্যবহারে আমাদের আপত্তি, কারণ, আমাদের মতে, ইসলাম এ বিষয়গুলোকে অন্ধ বিশ্বাসের ভিত্তিতে মেনে নেয়ার জন্য কাউকে আহবান জানায় না, বরং বিচারবুদ্ধি (‘আক্ব্ল্)-এর দ্বারা বুঝেশুনে এগুলোর সত্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে এর ভিত্তিতে জীবন যাপনের আহবান জানায়। কোরআনের পরিভাষায় একেই “ঈমান্” বলা হয়েছে। ঈমানের পরবর্তী পর্যায়ে এগুলোর তুলনায় ছোটখাট বিষয়ে অর্থাৎ জীবন যাপনের বিস্তারিত বিধি-বিধান ও অন্যান্য জ্ঞানগত বিষয়ে, বিশেষতঃ যে সব বিষয়ে মানুষের বিচারবুদ্ধির পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারার নিশ্চয়তা নেই যারা উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের সত্যতায় উপনীত হয়েছে তাদেরকে সে সব ক্ষেত্রে অবশ্যই কোরআন ও হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর কথা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হবে; এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ‘বিশ্বাস’ শব্দের ব্যবহার করে সে ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি নেই।
অন্যান্য ধর্ম যেখানে তাদের মৌলিক উপস্থাপনাকে বিচারবুদ্ধি (‘আক্ব্ল্)-এর কাছে পেশ করে নি, সেখানে ইসলাম তার উপরোক্ত তিনটি মৌলিক উপস্থাপনাকে বিচারবুদ্ধির কাছে পেশ করেছে। অন্যান্য ধর্ম যখন বলে যে, দু’জন, তিন জন বা আরো বেশী সংখ্যক ঈশ্বর রয়েছেন, যখন বলে যে, অমুক ব্যক্তি ঈশ্বরের পুত্র, বা অমুক ব্যক্তি স্বয়ং ঈশ্বর মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছেন, তখন এর সপক্ষে তারা কোনো অকাট্য প্রমাণ, বিশেষ করে মানব প্রজাতির কাছে সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারবুদ্ধির দলীল তথা যুক্তি উপস্থাপন করে না। কিন্তু ইসলাম তার উপরোক্ত তিনটি বিষয়কে বিনা প্রমাণে গ্রহণ করে নিতে বলে না।
কোরআন মজীদ ‘আক্ব্ল্ (বিচারবুদ্ধি)-এর ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে। কমপক্ষে তেরোটি আয়াতে বলেছে : افلا تعقلون؟ – “অতঃপর/ তাহলে কি তোমরা বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাবে না?” যারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে না কোরআন তাদেরকে তিরস্কার করেছে, এমনকি চতুষ্পদ জন্তুর সাথে তুলনা করেছে। (এ সম্বন্ধে আমি আমার জীবন জিজ্ঞাসা গ্রন্থে ‘বিচারবুদ্ধি ও ইসলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি – যা নোট আকারে ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে সংক্ষেপণের স্বার্থে বিস্তারিত উল্লেখ থেকে বিরত থাকছি।)
কোরআন মজীদ আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যুক্তি উপস্থাপন করেছে :
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ
“তারা কি কোনো কিছু (কোনো আদি স্রষ্টা-উৎস) থেকে ব্যতীতই সৃষ্ট হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা?” (সূরাহ্ আত্ব্-তূর্ : ৩৫)
কোরআন অংশীবাদের মোকাবিলায় যুক্তি উপস্থাপন করেছে :
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
“এতদুভয়ে (আসমানসমূহে ও যমীনে) যদি আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ্ থাকতো তাহলে এতদুভয় ধ্বংস হয়ে যেতো।” (সূরাহ্ আল্-আম্বিয়া’ : ২২)
পুনরুত্থান সম্পর্কে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে :
قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ
“সে (পুনরুত্থান অস্বীকারকারী ব্যক্তি) বলে : পচেগলে যাওয়া অস্থিগুলোকে কে জীবিত করবে? (হে রাসূল!) বলুন : তিনিই জীবিত করবেন যিনি প্রথম বার উদ্ভাবন করেছেন; আর তিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি সম্বন্ধে অবগত।” (সূরাহ্ ইয়া-সীন : ৭৮-৭৯)
হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) ছিলেন একজন নিরক্ষর পূতচরিত্র মানুষ এবং নবুওয়াত-দাবীর আগে চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মক্কাহবাসীদের চোখের সামনে বসবাস করেন। ফলে এটা সুস্পষ্ট ছিলো যে, কোরআনের মতো গ্রন্থ তাঁর নিজের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। কোরআন একে যুক্তি হিসেবে পেশ করেছে :
قُلْ لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلا أَدْرَاكُمْ بِهِ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِنْ قَبْلِهِ أَفَلا تَعْقِلُونَ
“(হে রাসূল!) বলুন : আল্লাহ্ যদি (অন্যথা) চাইতেন তাহলে আমি তা (কোরআন) তোমাদের সামনে তেলাওয়াত করতাম না এবং এ সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করতাম না। আমি তো এর আগে তোমাদের মাঝে আমার গোটা জীবনই অতিবাহিত করেছি; অতঃপর তোমরা কি বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাবে না?” (সূরাহ্ ইউনুস্ : ১৬)
কোরআন মজীদ স্বীয় ঐশিতার বিষয়টির সপক্ষে কেবল এ যুক্তি পেশ করেই ক্ষান্ত থাকে নি, বরং স্থান ও কালের গণ্ডির উর্ধে এক চ্যালেঞ্জ প্রদান করেছে :
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
“আর আমি আমার এই বান্দাহর ওপর যা নাযিল করেছি তার ওপরে যদি তোমরা সন্দেহে নিপতিত হয়ে থাকো তাহলে তোমরা এর (কোনো একটি সূরাহর) অনুরূপ (মানগত দিক থেকে এর সাথে তুলনীয়) একটি সূরাহ্ (রচনা করে) নিয়ে এসো এবং এ ব্যাপারে (সাহায্যের জন্য) তোমাদের উপযুক্ততম ব্যক্তিদেরকে আহবান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২৩)
এ তিনটি বিষয়ে এ ধরনের আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
এ সব যুক্তি কে মানবে আর কে মানবে না তা স্বতন্ত্র ব্যাপার, কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে, কোরআন মজীদ তাওহীদ, আখেরাত ও কোরআন সহ নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ)-এর দাও‘আতকে বিচারবুদ্ধি তথা যুক্তির ওপর ভিত্তিশীল করেছে, বিনা যুক্তিতে অন্ধ বিশ্বাস হিসেবে উপস্থাপন করে মেনে নিতে বলে নি।
আমরা প্রমাণ করেছি যে, ইসলাম তার মৌলিক উপস্থাপনাগুলোর ব্যাপারে ‘বিশ্বাস’ বা ‘ধারণা’র কাছে আবেদন করে নি। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বাস, ধারণা ও আন্দায-অনুমানের আশ্রয় গ্রহণের নিন্দা করেছে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, অকাট্য জ্ঞান নেই এমন ধারণা বা বিশ্বাস সম্বন্ধে আরবী ভাষায় (কোরআন মজীদেও এবং যুক্তিবিজ্ঞানেও) شَکّ ও ظَنّ এই দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। شَکّ (শাক্ক্) হচ্ছে এমন ধারণা যেটিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অসত্য বলে মনে করে, যদিও সেটি অসত্য হবার ব্যাপারে তার নিশ্চিত জ্ঞান নেই; এটিকে আমরা আমাদের ভাষায় ‘সন্দেহ’ বলতে পারি। আর ظَنّ (যান্ন্) হচ্ছে এমন ধারণা যেটিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্য বলে মনে করে যদিও সেটি সত্য হবার ব্যাপারে তার নিশ্চিত জ্ঞান নেই; এটিকে আমরা আমাদের ভাষায় ‘বিশ্বাস’ বলতে পারি। কল্পিত দেব-দেবীর ওপর অন্ধ বিশ্বাস পোষণকারী অংশীবাদীদের সম্বন্ধে কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :
وَمَا يَتَّبِعُ أَكْثَرُهُمْ إِلا ظَنًّا إِنَّ الظَّنَّ لا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
“তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস বৈ অন্য কিছুর অনুসরণ করে না; নিঃসন্দেহে কোনো বিষয়েই বিশ্বাস সত্য থেকে মুখাপেক্ষতাহীন করে না।” (সূরাহ্ ইউনুস : ৩৬)
এবার আমরা “ঈমান্” কথাটির প্রকৃত তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি দেবো।
যারা তাওহীদ, আখেরাত ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ)কে সত্য বলে জানে এবং কোরআন অনুযায়ী চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কোরআন মজীদ তাদেরকে يا ايها الذين آمنوا বলে সম্বোধন করেছে। অনেকে কথাটির অনুবাদ করেন “ঈমানদার”, অনেকে অনুবাদ করেন “বিশ্বাসী”। آمَنوا হচ্ছে নামপুরুষে বহুবচনে অতীতকালবাচক একটি ক্রিয়াপদ, যার এক বচন হচ্ছে آمَنَ – যা মূলতঃ اَمِنَ ক্রিয়াপদের باب افعال; باب افعال-এর ক্রিয়া সাধারণতঃ সকর্মক হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে অকর্মকও হতে পারে। তাই آمَنَ-এর অর্থ সকর্মক ক্রিয়া অর্থে “সে নিরাপদ করলো।’ এবং অকর্মক ক্রিয়া অর্থে “সে নিরাপদ হলো।”
কোরআন মজীদে يا ايها الذين آمنوا ছাড়াও অন্যত্রও এ ক্রিয়াপদটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ক্বুরাইশদের সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে :
وَآمَنَهُمْ مِنْ خَوْفٍ
“আর তিনি (আল্লাহ্) তাদেরকে ভয়-ভীতি থেকে নিরাপদ করেছেন।” (সূরাহ্ ক্বুরাইশ্ : ৪)
সুতরাং সকর্মক ক্রিয়া হিসেবে يا ايها الذين آمنوا-এর অর্থ হবে “হে যারা নিরাপদ করেছো!” এবং অকর্মক ক্রিয়া হিসেবে এর অর্থ হবে “হে যারা নিরাপদ হয়েছো।” বলা বাহুল্য যে, সকর্মক ক্রিয়া অর্থে একটি কর্ম (مفعول – object) উহ্য রয়েছে, তেমনি কিসের থেকে নিরাপদ হয়েছে বা করেছে তা-ও উহ্য রয়েছে। আরবী সহ যে কোনো ভাষায়, তেমনি কোরআন মজীদেও, ‘উহ্য রাখা’ একটি বহুলপ্রচলিত নিয়ম, অবশ্য বিভিন্ন নিদর্শন থেকে বুঝা যায় যে, কোন্ কথাটি উহ্য রয়েছে। পরিভাষার ক্ষেত্রে সংক্ষেপণের স্বার্থে এ ধরনের উহ্যতা একটি সাহিত্যশিল্পসম্মত পদ্ধতি। তাই সম্ভাবনা হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি যে, অকর্মক ক্রিয়া অর্থে বাক্যটি হচ্ছে يا ايها الذين آمنوا من عذاب الاخرة – “হে যারা আখেরাতের শাস্তি হতে নিরাপদ হয়েছো!” আর সকর্মক হিসেবে বাক্যটি দাঁড়াবে يا ايها الذين آمنوا انفسهم من عذاب الاخرة – “হে যারা আখেরাতের শাস্তি হতে নিজেদেরকে নিরাপদ করেছো!”
এ থেকে কারো মধ্যে যেন এরূপ ভুল ধারণা তেরী না হয় যে, তাদেরকে নিঃশর্তভাবে আখেরাতের শাস্তি থেকে নিরাপদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মোটেই তা নয়। আমরা এখানে ব্যাকরণিক বিশ্লেষণের সুবিধার্থে পুরো কথাটির শুরুর দিকটা নিয়ে আলোচনা করেছি, নচেৎ তারা কীভাবে নিজেদেরকে নিরাপদ করবে তা-ও কোরআন মজীদে বিভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে : يؤمنون بالغيب/ بالله – “তারা ইন্দিয়াতীত সত্তাকে/ আল্লাহকে অবলম্বন করে (নিজেদেরকে) নিরাপদ করে।” অন্যান্য শর্ত হচ্ছে আখেরাতের ওপর প্রত্যয়, হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) ও কোরআনকে আশ্রয় করা এবং যথাযথ কর্ম সম্পাদন। (এখানে আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করছি না; আলোচ্য বিষয়ের জন্য তার প্রয়োজনও নেই।)
এখানে কেউ হয়তো “ঈমান্” শব্দের ‘বিশ্বাস’ অনুবাদের ওপর অটল থাকার চেষ্টা করতে পারে। তাই আমরা তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই যে, অনুবাদটি সঠিক তাহলে “আমি আল্লাহ্কে বিশ্বাস করি” কথাটি হবে آمنت اللهَ -এর অনুবাদ, কিন্তু বাস্তবে কথাটি হচ্ছে آمنت باللهِ এবং সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে “আমি আল্লাহকে অবলম্বন করে বিশ্বাস করি।” সে ক্ষেত্রে “কী বিশ্বাস করি” সে মূল কথাটিই উহ্য থেকে যাচ্ছে। আর উহ্য কথাটি যা-ই হোক না কেন, “আল্লাহকে বিশ্বাস করি” বলে যে অনুবাদ করা হয় তা আর থাকছে না।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আরবের মুশরিকরা “আল্লাহ্” নাম সহকারেই আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করতো, কিন্তু তাঁর শক্তি-ক্ষমতার সাথে কল্পিত দেব-দেবীদেরকে শরীক গণ্য করতো। এরশাদ হয়েছে :
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى
“আর যারা তাঁকে (আল্লাহকে) ছাড়াও অন্যান্য অভিভাবক (উপাস্য) গ্রহণ করে, (তারা বলে) : আমরা এ উদ্দেশ্যে ব্যতীত তাদের উপাসনা করি না যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ করে দেবে।” (সূরাহ্ আল্-যুমার্ : ৩)
তারা আল্লাহ্ তা‘আলার অস্তিত্ব এবং তাদের কল্পিত দেব-দেবীদের ওপর আল্লাহর সর্বোচ্চ মর্যাদা স্বীকার করা সত্ত্বেও তাদেরকে ঈমানদার হিসেবে গণ্য করা হয় নি।
ওপরের সংক্ষিপ্ত আভাস থেকেই সুস্পষ্ট যে, কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে ঈমান মানে ‘বিশ্বাস’ তো নয়ই, এমনকি কেউ যদি বিচারবুদ্ধির দ্বারা তাওহীদ, আখেরাত, নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ) ও কোরআনের ঐশিতার সত্যতা সম্বন্ধে অকাট্য জ্ঞানের অধিকারী হয় এবং তা স্বীকারও করে, কিন্তু এ সবকে অবলম্বন বা আশ্রয় না করে তথা আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে শিরোধার্য করে না নেয়, বরং ঔদ্ধত্যের সাথে তাঁর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে তাহলেও সে ঈমানদার নয়। অবশ্য মানুষ মানবিক দুর্বলতার কারণে নাফরমানী করে বসতে পারে, তবে সে যদি অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায় ও নিজেকে সংশোধন করে তো তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু পরিকল্পিতভাবে নাফরমানী করলে সে ঈমানদার নয়। ইবলীস্ আল্লাহ্ তা‘আলার অস্তিত্ব ও একত্ব সম্বন্ধে অকাট্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলো এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছে, কিন্তু সে ঔদ্ধত্যের সাথে তাঁর নাফরমানী করতো, তাই সে ছিলো কাফের। এমনকি সে হযরত আদম (‘আঃ)কে সিজদাহ্ করতে অস্বীকৃতি জানাবার পূর্ব থেকেই কাফের ছিলো, বরং একদল কাফের জিনের নেতা ছিলো। আল্লাহ্ বলেন :
أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ

“সে বিরত থাকলো এবং অহঙ্কার করলো; বস্তুতঃ সে কাফেরদের অন্যতম ‘ছিলো’।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ৩৪)

[সং গৃহীত]
ঈমান ও বিশ্বাস ঈমান ও বিশ্বাস Reviewed by বায়ান্ন on April 15, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.