ছয় ওয়াক্ত নামাজ - ফিলিস্তিনিদের গল্প

সময় তখন দুপুর ২টা বেজে ৩০ কিংবা ৩৫ মিনিট হবে। ওজু করার জন্য পানি খুঁজছে আলিফ। বাথরুমে জমিয়ে রাখা পানিও প্রায় শেষ। একটু আগেও একবার ওজু করেছিল সে জোহরের নামাজ আদায় করার জন্য। এখন সে আবার ওজু করবে। আবার ওজু করার একটি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এখন। কিন্তু কি সে প্রয়োজন?
আলিফের ছোট বোন শাহেদা জিজ্ঞেস করল। এইমাত্র না তুমি নামাজ আদায় করে ফিরলে ভাইয়া? আবার ওজু করবে কেন তুমি এখন? বারবার ওজু করার মতো অত পানি কী এখন আছে আমাদের?
ছোট্ট বোনের অবুঝ মনের প্রশ্ন। যৌক্তিক আবদার। শুধু গাজা এলাকা নয়- সব ফিলিস্তিনিই এখন সর্ব সঙ্কটে দিন কাটান। নেই পর্যাপ্ত পানি, নেই কোনো জীবনের আস্থা। ওজুর পর ওজু করার মতো অবস্থা এখন আর ফিলিস্তিনে নেই। গতকালও যে এলাকাটি নবিদের পদভারে আলোড়িত ছিল।
আলিফ ভাবল ওর এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আবার আসল কথাটি বলতেও চাইল না সে।
আলিফ- আছে আপু মনি। এখন একটি আমল আছে আমার। ওজু ছুটে গেছে তো তাই আবার ওজু করে আমলটি করতে হবে। পানি কম বলে তো আর বিনা ওজুতে আমল করা যাবে না শাহেদা!
শহেদা- আচ্ছা তাহলে যাও। ওজু করো এবং আমল করো।
আপন মনে চলে গেল আলিফ। ওজু করল এবং সারি দ্ধভাবে দাঁড়ানো মানুষদের নিয়ে একটি আমল পূর্ণ করল।
আলিফ। ফিলিস্তিনের গাজা মহল্লার ২২ বছর বয়সী এক কিশোর। অদম্য তরুণ। সারা অঙ্গজুড়ে নূর আর নূর। আলো আর আলো। চেহারার আলোর সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে আছে পোশাক-আশাকের শুভ্র আলো। ব্যবহারের আলো। মানসিকতার শুভ্রতা। ফেরেশতার মতো দেখতে অনেকটা। গাজার ছোট্ট এক ফলের দোকানি আবু আনসারের সন্তান আলিফ। গাজায় প্রতিষ্ঠিত একটি মাদরাসা থেকে হাফেজি শেষ করার পর উচ্চ মাধ্যমিক জামাতের ছাত্র এখন সে। দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা, ফুপা-ফুপি, খালা-খালু আর ছোট্ট একটি বোন- সব মিলে বেশ বড় একটি পরিবারের একজন ছোট্ট সদস্য আলিফ। ছোট্ট সদস্য হলেও আলিফের সমাদরে মুখরিত গোটা পরিবার। কারণ হলো বংশ পরম্পরায় আলফিই একমাত্র সদস্য যে পবিত্র কোরআন হিফজ করেছে। আলিম হচ্ছে। দাদার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানকে আলিম বানাবেন কিন্তু সে স্বপ্ন তার পূরণ হয়নি। আলিফকে নিয়ে তাই তার স্বপ্ন অনেক বড়।
ভাইয়া! তুমি আজো অসময়ে ওজু করছ? এখন আবার কোন ওয়াক্তের নামাজ আদায় করবে তুমি? একটু আগেই না তুমি মাগরিবের নামাজ পড়ে এলে?
আলিফকে মাগরিবের নামাজের পর আবার ওজু করতে দেখে এক শ্বাসে প্রশ্নগুলো ছুড়ল শাহেদা। বড় ভাই আলিফকে খুব পছন্দ করে শাহেদা। সারাক্ষণ শুধু ভাইয়া ভাইয়া জিকির তার। এখন ভাইয়া কী করছে, একটু পরে আলিফ কী করবে? শাহেদার সব জানা থাকা চাই-ই চাই। ভাইয়ার সব কাজ নিয়ে শাহেদার তাই একটু বেশি কৌতূহল।
কী হলো ভাইয়া কিছু বলছ না কেন? আবার ওজু করবে কেন তুমি? কি আমল আছে এখন তোমার?
শাহেদার কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সোজা বাইরে চলে গেল আলিফ। সঙ্গে বেরিয়ে গেল তার বাবা আবু আনসারও। ভাই-বাবার সঙ্গে বাইরে যেতে চাইল শাহেদা। চিৎকার করে বলল আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও ভাইয়া। আমিও তোমার সঙ্গে তোমার আমলে শরিক হতে চাই। মায়ের বারণ এসে বাধা হলো। বাইরে আর যাওয়া হলো না শাহেদার। শরিক হওয়া হলো না ভাইয়ার আমলে।
শাহেদা। আবু আনসার আফাসির সর্বকনিষ্ঠ কন্যা। আগাগোড়া জেদি একটি মেয়ে। বয়সের তুলনায় আমলের প্রতি আগ্রহ তার অতুলনীয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এখনই অভ্যস্ত সে। বয়স মাত্র ১২ বছর। খুব বড় কোনো কারণ ছাড়া কখনও বাদ যায় না প্রতিদিনকার কোরআন তেলাওয়াতের আমলও। যথেষ্ট অনুগত সে বাবা-মায়েরও।
বড় ভাইয়ের এই লুকোচুরি আর বার বার ওজু করা দেখে শাহেদার মনে সন্দেহ হলো- বড় ভাইয়া মনে হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সঠিকভাবে সময়মতো আদায় করেন না। তাই অসময়ে ওজু করেন এবং কাজা নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদ বা অন্য কোথাও চলে যান। কিন্তু তাহলে বাবা-মা তাকে কিছু বলেন না কেন? আবার মাঝে মাঝে বাবাও তো ভাইয়ার সঙ্গে অসময়ে ওজু করেন এবং আমলের নামে ভাইয়ার সঙ্গে বাইরে চলে যান। আর প্রতিদিন এভাবে নামাজের সময় ছাড়া নামাজে যাওয়াটা মা কখনোই মেনে নিতেন না।
বেশ ভাবনায় পড়ে গেল শাহেদা। ভাই-বাবার অতিরিক্ত আমল কী- সেটা তার জানা চাই-ই চাই।
মা! মা! এই যে মা। আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দাও তো!
মা- কি প্রশ্ন শাহেদা?
শাহেদা- আচ্ছা আব্বু এবং ভাইয়া প্রায় প্রতিদিন নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ওয়াক্ত ছাড়া ভিন্ন ওয়াক্তে ওজু করে কী আমল করার জন্য বাইরে যায়?
মা- এটা জেনে তুমি কী করবে শাহেদা? এত কিছু জেনে তোমার লাভ নেই। তুমি এখনও অনেক ছোট। তোমার আমল তুমি আদায় কর। আর তোমার আব্বু ও ভাইয়া অতিরিক্ত কিছুই করেন না। এ আলম এখন সব ফিলিস্তিনির নিয়মিত আমল! যাও যাও তুমি এবার পড়তে বসো গিয়ে।
মায়ের কথায় পিপাসা মিটল না শাহেদার বরং আরও বেড়ে গেল তার জিজ্ঞাসা। কী এমন আমল রয়েছে- যা সব ফিলিস্তিনিই এখন করে? মনে মনে একটি প্রতিষ্ঠা করল শাহেদা। আগামীকাল ভাইয়া এবং বাবা উভয়কে লক্ষ্য করবে সে। সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন কিনা তারা। যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে কোনো ব্যতিক্রম সে খুঁজে পায় তাহলেই মিলে যাবে তার সব প্রশ্নের উত্তর। আর যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক সময়মতো আদায় করেন তারা, তাহলে?
চুপি চুপি আলিফ এবং বাবার প্রতি লক্ষ্যষ রাখল শাহেদ। ফজরের নামাজ শেষ হলো। ভাই এবং বাবাকে ঠিক সময়মতো নামাজ আদায়ে যেতে দেখল এবং আবার ফিলে আসতেও দেখল সে। জোহর, আসর এবং মাগরিবের নামাজেও কোনো ব্যতিক্রম খুঁজে পেল না শাহেদা। যথারীতি এশার নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরল বাপ-বেটা। শাহেদার ভাই আলিফ এবং বাবা আবু আনসার।
ও একটি কথা তো এখানে বলাই হয়নি। আজ এশার নামাজের কিছুক্ষণ আগে একটি প্রকাণ্ড আওয়াজের ভয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল শাহেদা। খুব পরিচিত শব্দ কিন্তু আজকের শব্দটি খুব কাছে মনে হয়েছে তার। এই একটি শব্দ এখন শুধু শাহেদা নয়, গোটা ফিলিস্তিনিদের খুব পরিচিত শব্দ। কোনটা বোমা ফাটার শব্দ আর কোনটা গুলি একজন বাচ্চা ফিলিস্তিনিকে তা এখন আর কারও বলে দিতে হয় না। আওয়াজটি শোনার পর ভয়ে শাহেদা তার মায়ের কাছে চলে গিয়েছিল এবং মাকে বলেছিল- মা আজকে মনে হচ্ছে, ইসরাইলিরা আমাদের কাছাকাছি কোথায় হামলা চালাচ্ছে!
দোয়া কর মা, দোয়া কর! আল্লাহ যেন আমাদের রক্ষা করেন। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এখন আর আমাদের কেউ নেই।
এশার নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে আছে শাহেদা। সঙ্গে তার মা। এরই মধ্যে সে দেখল আলিফ এবং তার বাবা ওজু করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বাথরুমের কথা বলে মায়ের কাছ থেকে উঠে শাহেদা এবার চুপি চুপি ভাইয়া ও বাবার পিছু নিল।
সামনে এগিয়ে চলছে আলিফ, সামনে চলছে তার বাবা। পিছু পিছু আসছে শাহেদা।
শাহেদা দেখল তার ভাই ও বাবা মসজিদের সামনে ময়দানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে এবং সেখানে শুধু তারা নয়, আরও অনেক মুসলিম ভাইয়েরা উপস্থিত রয়েছেন। খাটিয়ার ওপর কিছু একটা বিছানো দেখল শাহেদা। ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল। এরপর সে দেখল নামাজ আদায় করার মতো সবাই কাতার সোজা করে দাঁড়িয়ে গেছেন। শাহেদা ভাবলো— উনারা এই রাতে মসজিদের বাইরে কীসের নামাজ পড়ছেন? পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়া তো এই সময়ে পড়ার মতো কোনো নামাজ ইসলাম ধর্মে আছে বলে আমি জানি না।
একদিকে শাহেদা ভাবছে আর অন্যদিকে আলিফ আল্লাহু আকবার বলে তাকবির দিচ্ছে। হঠাৎ একটি বিকট শব্দে নিস্তব্ধ হয়ে গেল শাহেদার ভাবনা এবং আলিফের তাকবির। হেলিকপ্টার থেকে ছুড়ে মারা একটি বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল শাহেদার ছোট্ট দেহ। এক টুকরো চিৎকার ছুটে এলো তার জবান থেকে। ভাইয়া…
নামাজ ছেড়ে পেছনে ফিরে তাকিয়ে জোরে দৌড়াল আলিফ। কাছে এসে ছোট্ট বোন শাহেদাকে কোলে তুলে নিতে না নিতেই বিদায় নিল শাহেদা। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। শাহেদার চোখ থেকে একটি প্রশ্নই শুধু নাড়া দিচ্ছিল আলিফকে- এখন তোমরা কীসের নামাজ আদায় করছিলে ভাইয়া। কীসের আমল এটা?
ছোট বোন শাহেদার কাফন মোড়ানো দেহকে সামনে রেখে দণ্ডায়মান আলিফ। তার পেছনে দণ্ডায়মান বাবাসহ আরও বেশ কজন মুসলিম। মুখ ফুটে একখানা কথা বেরিয়ে এলো আলিফের।
হে আমার বোন! আমার আদরের শাহেদা। এত দিন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে মৃত ফিলিস্তিনিদের জানাজার নামাজ আদায় করতে আসতাম। আর আজ আমি তোমার জানাজার নামাজ পড়াচ্ছি।
তোমার জানার খুব ইচ্ছা ছিল নামাজের সময় ছাড়া অসময়ে কী আমল করি আমি! শুধু আমি নই হে বোন আমার! আমরা সব ফিলিস্তিনিই এখন প্রতিদিন ছয় ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার পাঁচ ওয়াক্ত সঙ্গে জানাজার এক ওয়াক্ত নামাজ আমরা এখন প্রতিদিনই আদায় করি। আর আজও আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর ষষ্ঠ ওয়াক্তে তোমার জানাজার নামাজ আদায় করছি।
মূল: ইবরাহিম নাসরুল্লাহ। ভাষান্তর: মিরাজ রহমান
[ইবরাহিম নাসরুল্লাহ সম্পর্কে- ইবরাহিম নাসরুল্লাহ আদতে একজন কবি। তার জন্ম জর্দানের রাজধানী আম্মানে ১৯৫৪ সালে। বাবা ফিলিস্তিনি। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের ‘করিয়াতুল ব্রিজ’ থেকে ০.২৮ কিলোমিটার পশ্চিমে জেরুজালেমে অবস্থিত বাড়ি থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। আরবদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল লেখক বলে তাকে বিবেচনা করা হয়। ‘আরব ও বিদেশি সম্পর্ক’ বিষয়ে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ১৯৭৬-১৯৭৮ পর্যন্ত ‘জারিদা আদ-দাসতুর’, ‘সাওত আশ-শিয়াব’, ‘আল উফুক’ ও অন্যান্য সংবাদপত্রে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। অন্তত দুইবার ইসরায়েলি ও জর্ডানের সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন তিনি এবং এক দশকের বেশি সময় কারাগারে কাটান। ‘আনাশিদ আস-সবাহ’ নামে ১৯৮৪ সালে তিনি একটি মহাকাব্য রচনা করেন, যা সাহিত্যাঙ্গনে তুমুল আলোড়ন তোলে। এ ছাড়াও ‘নুমান ইয়াসতারিদু লাওনুহু’ ও ‘ফসিহাতুস সালাব’ নামে তার আরো দুটি প্রসিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। ১৯৮৫ সালে তার প্রথম সার্থক উপন্যাস ‘বারারিউল হুম্মা’ এবং ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘হারিসুল মাদিনাতিয যয়িয়াহ’সহ আরো ২৬টি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। আরব আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন ইবরাহিম নাসরুল্লাহ। প্রতিবাদ ও আধ্যাত্মবাদ তার রচনার মূল সুর।]
ছয় ওয়াক্ত নামাজ - ফিলিস্তিনিদের গল্প ছয় ওয়াক্ত নামাজ - ফিলিস্তিনিদের গল্প Reviewed by বায়ান্ন on April 12, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.