মিয়ানমার ইস্যুতে কোয়াড ভূমিকা রাখতে পারে

মিয়ানমারে চলমান অস্থিরতার আপাতত কোন সমাধান প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে না। ফেব্রুয়ারির ০১ তারিখে দেশটিতে সামরিক অভ্যুথান ঘটে৷ দিন দিন বিভোক্ষ বাড়ছে৷ সামরিক জান্তা বিভোক্ষ দমনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে৷
সামরিক বাহিনীর এহেন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কেবল অবরোধ আরোপ ও কঠোর ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অভ্যুত্থানটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন মহামারীর কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। অবরোধ আরোপের ঘটনা মানবিক সমস্যা বাড়িয়ে তুলবে। টাটমাডাকে হটিয়ে জণগনের সরকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের প্রতিক্রিয়া আরো জোরালো হওয়া উচিত।
মিয়ানমারের চলমান অস্থিরতার সমাধানে নব্য উজ্জীবিতি কোয়াড উত্তম একটি মাধ্যম হতে পারে৷ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতের সমন্বয়ে গঠিত এই জোট ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলের উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিভূ হিসেবে নিজেদের দাবি করে থাকে৷
কোয়াডকে চীন বিরোধী জোট বলা হলেও সম্প্রতি শেষ হওয়া বৈঠকে জো বাইডেন প্রকাশ করেছেন এর সর্বব্যাপী এজেন্ডা রয়েছে৷ কোয়াড সদস্যরা উচ্চাবিলাসী ভ্যাকসিন সরবরাহ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে৷ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন ফোরাম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোয়াড নেতারা মিয়ানমার ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এর সমাধানে অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে মিয়ানমার ইস্যুতে কোয়াড কিছুটা বিভক্ত। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া অভুত্থানের কঠোর নিন্দা করেছে,সেখানে জাপান ও ভারতের প্রতিবাদের সুর কিছুটা ক্ষীণ। সম্ভবত চীনের প্রতি মিয়ানমারের অধিক ঝুঁকে যাওয়ার আশংকায় তারা শংকিত। এরপরও টোকিও ও নয়াদিল্লি মিয়ানমারের অচলাবস্থার ইতি টানতে একটি পথ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে৷
সম্প্রতি বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে প্রকাশিত তালিকায় জাপান ও ভারতের নাম যুক্ত হয়েছে যারা এখনও টাটমাডাকে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতায় কাজ করছে। এই ঘটনা বলে দেয় দেশ দুটি উদ্দেশ্য সাধনে শক্ত প্রতিপক্ষ হতে পারে।
শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ও চীনের সুবিধাবাধী চলাচলকে আটকাতে জাপান ও চীন কোয়াডের মাধ্যমে চমৎকার কাজ করে চলেছে। যখন বার্মিজ বিক্ষোভকারীরা ক্রমশ বেইজিং থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তখন টোকিও ও দিল্লীর জন্য কাজ করার এটা একটা উপযুক্ত সময় হতে পারে।
মিয়ানমার সংকট নিরসনে জাপান ও ভারত কার্যকর ভূমিকা রাখাতে পারে৷ কেননা মিয়ানমারের ক্ষমতা বলয়ের জটিল জালের প্রতিটি ছিদ্র সম্পর্কে দেশ দুটির গভীর জানাশোনা আছে।
২০১৫ সালে এনএলডি ক্ষমতায় আসার পর জাপান অং সান সূচি ও টাটমাডা উভয়ের সাথেই যোগাযোগ রক্ষার কৌশল নিয়েছিল। এমনকি ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে উঠলে পশ্চিমা দেশ সহ অনেকে যখন বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছিল তখন জাপান উলটো কাজ করেছিল।
জাপান দেশটিতে বিনিয়োগ ও বৈদেশিক অনুদান দেয়া অব্যাহত রাখে৷ জাপান মিয়ানমারে ৩য় বৃহৎ বিনিয়োগকারী ও বৃহত্তম দাতা দেশ। একই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে জাপান আরাকান আর্মি ও টাটমাডার মধ্যে শান্তি স্থাপনে মধ্যস্থতা করে।
টাটমাডার সাথে গভীর সম্পর্ক থাকার পরেও অভ্যুথানের বিষয়ে জাপানের পরিষ্কার অবস্থান বিশ্বকে চমকিত করেছে। যদিও প্রথমদিকে জাপানের প্রতিক্রিয়ায় ক্যু শব্দটি অনুপস্থিত ছিল।
ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে শান্তিপূর্ণ মিছিলে ভয়াবহ গুলি বর্ষণ ঘটলে জাপান সামরিক নৃশংসতা ও অভ্যুত্থান নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানায়। প্রতিক্রিয়ার পিছনে কারণও রয়েছে। চীনের কারণে মিয়ানমারে জাপানের অর্থনৈতিক প্রভাব দিন দিন সংকুচিত হয়েছে পড়ছে।
এর আগের দিনগুলোতে মিয়ানমারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জাপান নানাভাবে কাজ করেছে। আইনের শাসন, সুশাসন এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে সাজাতে সহযোগিতা করেছে। নির্বাচনের সরঞ্জাম ও প্রতিনিধি পাঠিয়েছে, স্থানীয় সরকারের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও কাজ করেছে। এমনকি দেশটির বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নেও জাপান সাহায্য করেছে।
জাপান দেশটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও দূতিয়ালি করেছে৷ গত কয়েক দশকে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন স্থাপন করে ইয়াঙ্গুন সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছে। চীনের সাথে টাটমাডার সুসম্পর্ক থাকলেও কিছু ব্যাপারে অবিশ্বাসও রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র দেয়ার অভিযোগে চীনকে টাটমাডা প্রায় দায়ী করে থাকে। এসব বিবেচনায় জাপান টাটমাডার বিশস্থতা অর্জন করেছে যা অগ্রাহ্য করা উচিত হবে না।
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানে ভারত স্পষ্ট বিরোধিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে। তবুও নাইপিদোর সাথে দিল্লীর সম্পর্ক বর্তমান সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১৯৮৮ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সমর্থন ও ১৯৯০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে নিন্দা করার ফলে মিয়ানমার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। দিল্লীর সীমানায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল। এসব দিক বিবেচনা করে দিল্লী টাটমাডোর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করে।
ভারত লুক ইস্ট পলিসির বাস্তবায়নে মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এই লক্ষ্যে ভারত কালাদান বহুমুখী প্রকল্প ও ত্রিদেশীয় হাইওয়ে করিডোর নামে বৃহৎ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এসবের উদ্দেশ্য যে চীনের BRI প্রকল্পের সাথে প্রতিযোগিতা করতেই হাতে নেওয়া তা স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়৷
বন্ধু দেশ হিসেবে ভারত মিয়ানমারের নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেবা খাতের উন্নতিসাধন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমৃদ্ধিতে কারিগরি ও অবকাঠামোগত সাহায্যের পাশাপাশি ১ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করেছে৷
প্রকৃতপক্ষে বিগত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী চীনের পাশাপাশি ভারতের উপরও নির্ভরতা বাড়িয়েছে। গত বছর ভারতের সেনাপ্রধান ও পররাষ্ট্র সচিব নাইপিদো সফরকালে মিয়ানমারকে একটি কিলো সাবমেরিন উপহার দিয়েছে।
বর্তমান অভ্যুত্থানের মূল হোতা মিন অং হ্লাই ২০১৯ সালে ভারত সফর করেন। এটা বলা হয় যে টাটমাডা চীনের চেয়ে ভারতের উপর অগাধ বিশ্বাস লালন করে৷ এর কারণ হিসেবে বলা হয় টাটমাডা ধারণা করে যে, চীন BRI প্রকল্পের সফল রূপায়নে দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে মিয়ানমারের বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপকে অস্ত্র সরবরাহ করে৷
টাটমাডার সাথে এই সুসম্পর্কের দরুণ ভারত বর্তমান অভ্যুত্থান নিয়ে কড়া বক্তব্য দিতে পারছে না। এরপরও ভারত ভবিষ্যৎ সমঝোতায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিরক্ষা ও সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভারত সংকট সমাধানে সামরিক বাহিনীর সাথে আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারে। ভারতের ভ্যাকসিন কূটনীতিও এই ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হতে পারে।
কোয়াড ভুক্ত দেশগুলো মিয়ানমারের চলমান অস্থিরতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের চোখে দেখছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বেশ কয়েকটি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখের বৈঠকে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কিভাবে পুনর্বহাল করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে কোয়াডভুক্ত দেশগুলো এ ব্যাপারে কতটা সক্রিয়। তারা কোনভাবেই এই কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগকে নষ্ট করতে চান না।
এখন পর্যন্ত কোয়াড দুই ফ্রন্টে কাজ করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া বিক্ষোভাকারীদের সব উপায়ে সাহায্য করছে, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাও গতিশীল করেছে। অন্যদিকে জাপান ও ভারত টাটমাডার সাথে পিছন ঘরে আপস আলোচনায় অংশ নিতে পারে।
জাপান ইতোমধ্যে বৈদেশিক সাহায্য ও নতুব প্রকল্প স্থগিত করেছে৷ কিন্তু বিশ্বকে না জানিয়ে নীরবে অবরোধ আরোপ খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে না।
টাটমাডার বৈদিশিক বাণিজ্য বন্ধে কোয়াডভুক্ত দেশগুলো শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিদেশী বিনিয়োগ আটকাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। মিয়ানমারে প্রায় ২০০০ বৈদেশিক কোম্পানি আছে যা যৌথ মালিকানায় পরিচালিত হয় যার সিংহভাগ বিনিয়োগে সামরিক বাহিনীর অংশ আছে।
ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে কর্তৃত্ববাদী শক্তির বিপরীতে গণতান্ত্রিক শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে মিয়ানমার পরিস্থিতি কোয়াডের যোগ্যতা প্রমাণের বিরল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা সংকট নিরসনে সর্বদা যুক্তরাষ্ট্রকে উপস্থাপন করলেও এই ক্ষেত্রে জাপান ও ভারত তাদের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে প্রত্যাশিত সময়ের চেয়েও দ্রুত সময়ে মিয়ানমারের অচলাবস্থার ইতি টানতে পারে।
ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত।
ভাষান্তরঃ এম আর রাসেল
মিয়ানমার ইস্যুতে কোয়াড ভূমিকা রাখতে পারে মিয়ানমার ইস্যুতে কোয়াড ভূমিকা রাখতে পারে Reviewed by বায়ান্ন on April 10, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.