একটি মৃত্যুসনদ

একটা মৃত্যু সনদ। যেন তেন সনদ নয় একেবারে বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় মেডিকেল কলেজের দেয়া মৃত্যু সনদ। সনদটা হাতে নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছেন নিজাম সাহেব। দাঁড়িয়ে থাকা নয় ঢলে পড়ে যাবেন এমন অবস্থা। হাটতে পারছেন না। পা যেন অচল, অসাঢ়, নিষ্কৃয়। মনে হচ্ছে সামনে যেন কেয়ামতের অন্ধকার। নিকশ কালো অন্ধকার। মাথাটা ঘুরছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মৃত্য রেজিস্টার রুম থেকে কোন মতে বের হয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। অব্যবহৃত ঔষধগুলো ফেরত দিয়ে আবারো নিউরো সার্জারী বিভাগের উদ্দেশ্য রওনা দিলেন তিনি। দীর্ঘ দশ দিনে হাসপাতালটা কেমন যেন পরিচিত হয়ে গেছে। মনে হয় অনেক দিনের পরিচয়। চেনা সব অলিগলি। বারান্দা ধরে এগিয়ে চলছেন। কানে বাজছে রোগীদের আত্মচিৎকার। বাইরে রোগীর স্বজনদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা।

হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন একটা ছোট্ট শিশুর হাসির শব্দ পেয়ে। একজন মা খেলছেন তার শিশু বাচ্ছাটার সাথে। বার বার আদর করছেন। চুমু খাচ্ছেন বাচ্ছাটার কপালে, মুখে। বাচ্ছাটা হেসেই শেষ। বাচ্ছাটার দিয়ে অপলক তাকিয়ে আছেন নিজাম সাহেব। হঠাৎই বাচ্চাটার মা নিজাম সাহেবকে দেখে বাচ্চাটাকে আঁচলে ঢেকে ফেললেন। দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো নিজাম সাহেবের। যদিও এতক্ষন কোন কান্না ছিলনা মুখে। বাচ্ছাটার কথা মনে হতেই হাউমাউ করে উচ্চস্বরে বাচ্চা ছেলেদের মত কান্না করতে শুরু করলেন। মাথায় হাত দিয়ে এবার হাসপাতালের বারান্দায় বসেই পড়লেন।

কতক্ষণ সময় পার হয়ে গেল ভুলেই গেলেন নিজাম সাহেব। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সকাল দশটা বেজে গেছে। উঠে দাঁড়ালেন। অনেকটা দৌড়ে গেলেন নিউরো সার্জারি বিভাগে ক্ষত বিক্ষত পড়ে থাকা নিজের স্ত্রীকে দেখতে। টানা সার্জারীর দকল এবং এ বিভাগ ও বিভাগে টেনে নিতে নিতে সে ক্লান্ত, ভীষন ক্লান্ত। ফারাবীকে খাওয়াতে খাওয়াতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে। যে এখনো জানেনা তার কলিজার টুকরো ফারবী অার নেই। এই আব্দুল্লাহ আল ফারাবী নাম সিলেকশন নিয়ে যে কত রাত, কত দিন, কত বই ঘাটাঘাটি, কতবার ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে খুজে বের করেছেন নিজাম সাহেব ও তার স্ত্রী মিলি। কত রাগ ছিল তার উপর কেন নাম সিলেক্ট করতে এত দেরি? কেন নামের কোন বই আনছেনা। এই নিয়েতো একদিন কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল তার সাথে।

কত স্বপ্ন, কত আকাঙ্খা, কত আবেগ,কত ভালোবাসা। কত রাত যে কেটে গেছে বাচ্চাদের পোশাক ও খেলনা খুজতে খুজতে অনলাইনে। সেগুলো কালেক্ট করে স্বামীকে মেসেঞ্জারে পাঠাতো আর বলতো “কোনটা সুন্দর, দেখোতো? এটার অর্ডার দাও ওটার অর্ডার দাও। আরো কত কি?
ফুটিয়ে পানি পান ছিল তার চরম অনভ্যাস কিন্তু ফারাবীর জন্য সেটাও অভ্যাসে পরিনত করেছিল সে। মশারি টাঙানো ছিল তার কাছে পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কর্ম কিন্তু নিজের অসুখ হলেতো ফারাবীরও অসুখ হবে তাই সে এটাও আয়ত্ব করে নিয়েছিল। নিজাম সাহেবের আজ সবচাইতে বেশি মনে পড়ছে একটা ঝগড়া কথা।

ফারবী কোথায় জন্ম নিবে এ নিয়েতো নিজাম সাহেবের সাথে তার মায়ের কত ঝগড়া হয়েছিল। মা বলে গ্রামে হবে। নিজাম সাহেব বলেন শহরে সুযোগ সুবিধা ভালো, ভালো ডাক্তারও পাওয়া যাবে কাছাকাছি। একদিনতো নিজাম সাহেবেররনমার সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও হয়ে গিয়েছিল। মা শহরের বাসায় আসাই বন্ধ করে দিয়ে ছিলেন।
ফারাবীর খালাতো ভাই ফারাবীর জন্যতো অাগেই মার্কেটিং করে রেখেছিল। ফারাবীর খালা তার জন্য কাথা সেলাই করে রেখেছেন। ফারাবীর দাদাতো নাতী হবে বলে খুশিতে আত্মহারা। আগেই বলে রেখেছেন কত কেজি মিষ্টি খাওয়াবেন। বড় ছেলের বড় নাতি বলে কথা। ফারবীর মামাতো আগেই বলে রেখেছেন ফারবীর জন্য কিছু যেন না কিনি, তিনি সবকিছু বিদেশ থেকে পাঠাবেন বাগীনার জন্য।

একে একে সব মনে পড়ে যাচ্ছে আজ নিজাম সাহেবের। প্রথমে কাকে ফোন করে জানাবেন এমন সংবাদটা। এ সংবাদ যে কেও আশা করেনি। ঘুর্নাক্ষরে কেওতো কল্পনাও করেনি এমনটা ঘটবে। দু একজনকে ফোন করতেই কান্নায় মোবাইল ভারী হওয়ার উপক্রম। খবর শুনে দাদা দাদীতো সাথে সাথেই বেহুশ। চারদিক থেকে কল অাসছে। কারো কলই আর রিসিভ করছেন না তিনি। সবার একই জিজ্ঞাসা?উত্তর জানা নেইই তার।

ফারাবীর অাকার সকল স্বাভাবিক বাচ্ছাদের থেকে একটু বড়ই ছিল। কেমন একটা অদ্ভুদ মায়া ছিল তার মুখে। সাধারন বাচ্ছারা অনেক দেরিতি হাসলেও সে কিন্তু ২য় দিনই সে হেসেছিল। বাবার হাতের আঙুলটা মুষ্টি করে ধরে রেখেছিল চলে যাবার আগের দিন। মাত্র অাট দিনের হায়াতে সে শত বছরের মায়া দিয়ে গিয়েছিল। হাসিটা ভীষন সু্ন্দর ছিল বিধায় হয়তো মহান রবের পচন্দ হয়েছিল। তাইতো তিনি জান্নাতের মেহমান করে ফারবীকে নিয়ে গেলেন।

এম্বুল্যান্সের দীর্ঘ যাত্রার সমময় মিলি প্রিয় সন্তানকে বুকে রেখে তখনো ঘুমোচ্ছে। ঘুম যেন মৃত্যু ঘুম। জাগ্রত থাকলেতো কতবার বেহুশ হতো তার ইয়ত্তা নেই। গাড়ী থেকে নেমেই নিজাম সাহেব বাড়া দেয়ার জন্য পকেটে হাত দিলেন। মানিব্যাগটা উদাও। দৌড়াদুড়ির কোন ফাঁকে যে পকেটমার তার তার কাজ করে গেছে খবর নেই। পকেটের সবকিছু নিয়ে গেলেও পড়ে রইলো মৃত্যু সনদটি।

একটি মৃত্যুসনদ একটি মৃত্যুসনদ Reviewed by বায়ান্ন on June 18, 2019 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.