বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিয়াম

◙ বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্ট থেকে দয়াময় আাল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং তাঁরই নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রসংশা একমাত্র আাল্লাহর যিনি সারা বিশ্বের স্রষ্টা।

শতকোটি দরূদ ও সালাম বিশ্ব-মানবতার মুক্তিদূত বিশ্বের একমাত্র সফল রাষ্ট্র নায়ক হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি।

◙ অর্থঃ
সিয়াম আরবী সওম ( ﺼﻮﻢ ) থেকে উৎপন্ন। এর শাব্দিক অর্থ উপবাস, বিরত বা দূরে থাকা, ত্যাগ করা, পানাহার থেকে বিরত থাকা। ইংরেজীতে একে Fast বলা হয় । আর হিব্রুতে তা’য়ানিত ( Ta’anit ) বলা হয়।

::: বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিয়াম :::

◙ হিন্দুঃ
হিন্দু ধর্মে পৃথক পৃথক ব্যক্তির ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার উপর ভিত্তি করে উপবাস করা অবশ্যই পালনীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিছু কিছু মাসে একাদশী বা পূর্ণিমার সময় উপবাস করতে হয়। ভারতের উত্তরাঞ্চলের হিন্দুদের বৃহস্পতিবারে উপবাস করা নিত্য ব্যাপার। এই দিনে তারা ধর্মীয় কাহিনী শুনে উপবাস ভঙ্গ করে। এই দিন তারা বৃহস্পতি দেবতার দয়া পাবার জন্য পূজা করে। বৃহস্পতি দেবতা হলুদ রং পছন্দ করেন, তাই এ দিনে হিন্দুরা সকল খাদ্য হলুদ রঙের বস্তু দ্বারা তৈরী করে।
কিছু নিত্য উপবাসের দিন হল- মহা শীবরাত্রী, নভরাত্রী (নয় দিন), বিজয় দশমী ( দিপাবলীর পূর্বেই ); এছাড়াও বিবাহিত মহিলারা তাদের স্বামীর দীর্ঘায়ু, সুস্থতা ও মঙ্গলের জন্য ”করওয়াচথ” নামের উপবাস করে। এই দিন তারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহন বর্জন করে এবং রাত্রে চন্দ্রালোতে স্বামীর চেহারা বা মুখ দেখে স্বামীর হাতে পানীয় পানের মাধ্যমে উপোস ভঙ্গ করে। এছাড়াও মনব্রথ নামে মৌন উপবাস করে। এসময় তারা কারও সাথে কোন কথা বলে না।

◙ বৌদ্ধঃ
বৌদ্ধ সন্ন্যাসি ও সন্ন্যাসিনি অভিন্ন বিনয়ী আইন মেনে দুপুরের খাদ্য গ্রহন ত্যাগ করে। এটি উপোস নয়, তবে এটি আধ্যাতিকতা অর্জনে সহায়তা করে। বৌদ্ধ আট দিন উপোস রাখতে বলেছেন, যা দুপুরের খাবার পর থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত কার্যকর। এছাড়াও কিছু উপোস বৌদ্ধদের করতে হয়।

◙ খ্রীস্টানঃ
খ্রীস্ট্রিয় ধর্মে উপোসের কথা গুরুত্ব সহ বলা হয়েছে। বাইবেলে ৫৮ অধ্যায়ে ৩-৭ লাইনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য উপবাস করা। প্রারম্ভিক অধ্যায়ে Book of Daniel -এ উপবাস করার উপকার ও উপোসকারীর স্বাস্থ্যে এর প্রভাব সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। সকল খ্রীস্টানরা উপবাসের চর্চা করে এবং চার্চে (উপাসনালয়) উপবাসের চর্চা করা হয়। যিশুর স্মরণের উদ্দেশ্যে ঈস্টারে পূর্বে ক্যাথলিকরা এবং চার্চে চল্লিশদিন ব্যাপি বাৎসরিক উপোস পালন করা হয়।
বাইবেলের অনেক স্থানে উপোসের কথা বলা হয়েছে। যেমন –
▀ নবী মুসা (আঃ) পর্বতে স্রষ্টার সাথে দেখা করার জন্য গিয়েছিলেন, তখন চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত উপোস করেছিলেন। [ Exodus 34:28 ]
▀ রাজা জোসেফ ( ইউসুফ ) ইহুদী রাজ্য জয়ের জন্য উপোস করেছিলেন। [ 2 Chronicles 20:3 ]
▀ নবী জেনাহ {ইউনুস (আঃ)} এর ডাকে সাড়া দিয়ে স্রষ্টার বিচার দিবসের ভয়ে নেনেভেহ্ শহরের লোকেরা উপোস করত। [ Jonah 3:7 ]
▀ মৃত্যূর পূর্বে যিশু চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত উপোস করেছিলেন। [ Matthew 4:2, Luke 4:2 ]
▀ দেব দূত আন্না ( Anna ) , যিনি উপাসনালয়ে যিশুর জন্মের পূর্ববার্তা নিয়ে এসেছিলেন, তিনি দৈনিক উপবাস করতেন। [ Luke 2:37 ]
▀ যিশু উপবাসকারীদের আচার-ব্যবহার , বাহ্যিকতা, উপাসনা শিক্ষা দিয়েছেন। [ Matthew 6:16 ]
▀ যিশু উপবাসকারীদের সতর্ক করে মানুষের সাথে উত্তম-ভাল ব্যবহার করার কথা বলেছেন এবং উপবাস ব্যক্তিগত জীবনে মানার পামর্শ দিয়েছেন। [ Matthew 6:16- 18 ]

◙ ইহুদীঃ
ইহুদীরা হিব্রুতে সিয়ামকে তা’য়ানিত বলে। ইহুদী ধর্ম মতে পানাহার থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা এমনকি পানি পান থেকে বিরত থাকাকে তা’য়ানিত বলে। প্রশিদ্ধ তা’য়ানিত ইয়ম কিপার (Yom Kippur) ও তিসা বা’ভ ( Tisha B’Av ) -এ দাঁত ব্রাশ বা পরিস্কার করাও নিষিদ্ধ, তবে সাধারন উপোসের ক্ষেত্রে শিথিল যোগ্য। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসময় কথা বলাও নিষিদ্ধ। সাধারনত ঐতিহ্যগত ইহুদী বছরে ছয়দিন তা’য়ানিত পালন করে । তবে এটি সাপ্তাহিক সাবাত (Shabbat) এর দিন নয় এমন দিনে এবং তা ইয়ম কিপার (Yom Kippur) এর দিন ব্যতিত। বাইবেলের আদেশ ও ধর্মযাজকদের ( রাব্বী ) প্রদর্শিত সাবাতের দিনে উপোস করতে হয়। ইয়ম কিপারের (Yom Kippur) কথা একমাত্র তাওরাতের মাধ্যমে আদেশপ্রাপ্ত ।

প্রথমত প্রশিদ্ধ তা’য়ানিত হচ্ছে ইয়ম কিপার (Yom Kippur)। ইয়ম কিপার প্রাপ্ত বয়স্ক সকল নারী-পুরুষের জন্য অবশ্যই পালনীয়। দুর্বল, অসুস্থ, বয়স্ক, গর্ভবতী, সেবিকা, এবং ইহুদী নয় এমন লোকদের জন্য ছাড় রয়েছে। ইয়ম কিপার ”পবিত্রতার পবিত্রতম ” দিন।
দ্বিতীয়ত প্রশিদ্ধ তা’য়ানিত হচ্ছে তিসা বা’ভ (Tisha B’Av)। অ’ভ হিব্রু ৫ম মাস ও সাধারন ১১শ মাস। প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে রোমান খ্রীস্টানরা জেরুজালেমের পবিত্র উপাসনালয় ধ্বংস করে এবং ইহুদীদের মাতৃভূমী থেকে তাদের বিতাড়িত করে। তিসা বা’ভ এর শেষ তিন সপ্তাহ ইহুদীরা শোকের তা’য়ানিত পালন করে।
উক্ত তা’য়ানিত নারী-পুরুষ সকলকেই পালন করতে হয়। একমাত্র রাব্বীদের অনুমতিক্রমে ইহা পালন থেকে বিরত থাকা যায়। উল্লেক্ষ্য উভয় তা’য়ানিত শারীরীক (যৌন) সম্পর্ক কড়াভাবে নিষিদ্ধ।

চারটি গণ-তায়ানিত হচ্ছে-
▀ জিধালিয়ার তা’য়ানিত [ The Fast of Gedaliah ]
▀ হিব্রু তিভেট মাস এর দশম দিন তা’য়ানিত [ The Fast of the 10th of Tevet ]
▀ হিব্রু মাস তামুঝ ১৭ তারিখ [ The Fast of the 17th of Tammuz ]
▀ ঈস্টারের দিন [ The Fast of Esther ]

অন্যান্য তা’য়ানিত [ যা জনগন জানতে পারে না, বিশেষকরে বিশ্ববাসী ]
▀ হিব্রু লেয়ার (Iyar) মাসের ও মার্চেসভান (Marcheshvan) মাসের ১ম সোম ও বৃহস্পতিবার
▀ প্রতিমাসের শেষ দিন
▀ হিব্রু নিসান (Nisan) মাসের ১৫ তারিখ; শুধুমাত্র ১ম পুত্র সন্তানের জন্মের জন্য পালন করতে হয়

▀ ইয়ম কিপার (Yom Kippur) সম্পর্কে বলা হয়েছে Isaiah, ৫৮:১-১৩ – এ।
▀ তিসা বা’ভ (Tisha B’Av) সম্পর্কে বলা হয়েছে Esther, ৪:৩,১৬ ; Jonah, ৩:৭ – এ।

◙ চিকিৎসা শাস্ত্রে গুরুত্বঃ
মেডিকেল সার্জারীর জন্য উপোস থাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়; বিশেষ করে অচেতন করার জন্য। কারন খাদ্যের উপস্থিতিতে অচেতনকারী ঔষধ ব্যক্তির শরীরে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে যা দেহের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য সার্জারী রুগীদের দৃঢ়ভাবে উপোস থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। সঙ্গত মেডিকের টেস্ট যেমন- কোলেস্ট্রল টেস্ট, রক্তের গ্লুকোজ টেস্ট এর জন্য কয়েক ঘন্টা উপোস থাকতে হয়, যাতে বেজলাইন বা মূল বিষয় পাওয়া যায়। কোলেস্ট্রল টেস্টের জন্য ১২ ঘন্টা পর্যন্ত উপোস থাকতে হয়।
মানুষ জীবনের শেষ মুহূর্তে খাদ্য ও পানীয় গ্রহন বন্ধ করে দেয়। মেডিকেলের ভাষায় একে বলা হয় Patient refusal of nutrition and hydration |

উপোসের ফলে মানব দেহে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। উপোসের প্রভাবে দেহে ক্যালোরী উৎপন্ন ক্ষমতা ৪০% বৃদ্ধি পায়।

▀ ২০১৬ সালে জাপানের চিকিৎসক ইয়োশিনোরি ওহসুমিকে অটোফেজির সূত্র আবিষ্কারের জন্য নোবেল কমিটি পুরস্কৃত করেন । এরপর থেকে মুসলিমদের বাইরেও অন্যান্য ধর্মালম্বিদের মাঝে অটোফেজি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এছাড়া আরেকজন বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী হেলমুট লুটজনার একটি বই লিখেন। বইটির নাম Secret of successful fasting. এই বইটি প্রচার হওয়ার পরপরই ইউরোপ, আমেরিকানরা, ফাস্টিং এ ঝুকে পরে, যার মূল উদ্দেশ্য শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়াটি চালু করা।

আসলে অটোফেজি কী, একটু জেনে নেওয়া যাক । অটো অর্থ নিজে নিজে আর ফেজি মানে ভক্ষণ। গ্রিক শব্দ ফাজেন থেকে ফেজি শব্দের উদ্ভব। তাহলে অটোফেজির অর্থ দাঁড়াচ্ছে ‘নিজে নিজেকে খাওয়া’। যার মানে আত্মভক্ষণ।শুনতে সাংঘাতিক মনে হলেও এটা আসলে আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী।

যখন আপনি দীর্ঘক্ষন খাওয়া বন্ধ করে দেন তখন দেহের কোষগুলো বাইরে থেকে কোনও খাবার না পেয়ে নিজেই নিজের রোগজীবাণু সৃষ্টিকারী কোষ ও বর্জ্য-আবর্জনা খেতে শুরু করে, আর এই প্রক্রিয়াকেই অটোফেজি বলা হয়। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই প্রক্রিয়া অব্যাবহারযোগ্য কোষগুলোকে পুনরায় নতুন কোষে রুপান্তর করে যেটা সত্যি বিস্ময়কর।

মানুষের বাড়িতে যেমন ডাস্টবিন থাকে বা কম্পিউটারে রিসাইকেলবিন থাকে, তেমনই মানবদেহের প্রতিটি কোষেও একটি করে ডাস্টবিন আছে। ডাস্টবিনটির নাম লাইসোজোম। সারাবছর দেহের কোষগুলো খুব ব্যস্ত থাকার কারণে লাইসোজোম নামক ডাস্টবিনটি পরিষ্কার করবার সময় হয়ে ওঠে না। ফলে কোষগুলোতে অনেক আবর্জনা জমা হয়। কোষগুলো যদি নিয়মিতভাবে ওদের ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে না পারে, তাহলে সেগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং এর ফলে অসুস্থ কোষ ও আবর্জনার প্রভাবে দেহে নানাবিধ রোগ বাসা বাঁধে। বিশেষজ্ঞদের মতে টিউমার, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের মতো বড় বড় রোগের শুরু হয় এভাবেই।

এছাড়া আমাদের দেহটা কিন্তু বড়ই অলস, আরাম প্রিয় এবং স্বার্থপর । ধরুন আপনি ঈদের জন্য নতুন জামা কিনলেন বা কেউ আপনাকে কিনে দিল। এখন আপনি কী করবেন? ঈদের দিনে অবশ্যই নতুন জামা পরবেন। পুরাতন জামা গুলো কিন্তু হ্যাংগারেই পড়ে থাকবে। তদ্রুপ আমরা যখন নিত্য নতুন খাবার খাই, এ অলস দেহ কিন্তু এই খাবার গুলোকেই শক্তি হিসেবে গ্রহন করে কিন্তু আপনার শরীরে যে অন্যান্য শক্তির আধার জমা হয়ে আছে সেটা কিন্তু দেহ ছুঁয়েও দেখে না। আর আপনি যখন দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন ঠিক তখনই আপনার শরীরে অটোফেজি শুরু হবে। অলস দেহ আর অলস থাকবে না, দেহের কোষ গুলো তখন তার বৈপ্লবিক কার্যক্রম শুরু করে দিবে।

আপনার দেহের কোষ গুলো যখন অটোফেজির মাধ্যমে নতুন ভাবে তৈরি হতে থাকবে তখন আপনি আপনার তারুণ্য ফিরে পেতে শুরু করবেন, যেমনি ভাবে বসন্তে গাছে নতুন পাতা গজানো শুরু করে ঠিক তেমনি। আর অপর দিকে আপনার দেহে যদি আগে থেকেই শুরু করতে পারেন ফ্যাট বার্নিং (যেটা কিনা ফ্যাট এ্যাডাপটেশনের মাধ্যমে শুরু হয় ) তাহলে দুটো মিলে দারুন Synergetic Effect দেয়।

যখন রোজা, ওয়াটার ফাস্টিং, অনশন বা দীর্ঘ সময় না খাওয়ার মাধ্যমে আপনি আপনার হারানো তারুণ্য ফিরে পাচ্ছেন সকল রোগ থেকে মুক্ত হচ্ছেন; অন্য দিকে, আপনার শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমতে শুরু করবে শরীরে জমে থাকা চর্বি গলে আর আপনি শক্তিও পেতে থাকবেন দুর্বল না হয়ে ।

তাই ওজন কমানোর ক্ষেত্রে বা সুস্থ সবল ভাবে তারুণ্য নিয়ে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে অটোফেজির তুলনা নেই। আর এই অটোফেজির প্রক্রিয়াটি শুরু করানোর জন্য, দীর্ঘ সময় ওয়াটার ফাস্টিং বা শুধু সেহরীতে পানি খেয়ে রোজা রাখা বা অন্যান্য ধর্মালম্বিদের জন্য অনশন বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কোন বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে শরীর নিজেই তার সকল রোগের চিকিৎসা নিজেই করে শুধু আমাদের প্রয়োজন শরীরকে একটু সেই সুযোগ তৈরী করে দেয়ে দীর্ঘক্ষন না খেয়ে থেকে ।

◙ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেঃ
উপোস একটি গুরুত্বপূর্ন রাজনৈতিক অস্ত্র, যা প্রতিবাদ, দাবী আদায়, নীতি পরিবর্তন ইত্যাদিতে সাহায্য করে। রাজনৈতিক দাবী আদায়, লক্ষ্য পূরন, নীতি পরিবর্তন, প্রতিবাদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে অহিংস আন্দোলন যা প্রতিপক্ষকে সহজেই ঘায়েল করে তা হচ্ছে অনশন ধর্মঘট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক খ্রীস্টান সংস্থা World Vision, যা খ্রীস্টানদের রাজনৈতিক সাহায্য করে, তা প্রতি বছর বিশ্বখাদ্যাভাব দূর করার জন্য এবং বিশ্বে দরিদ্রতা ও খাদ্যহীনতা দূর করার লক্ষ্যে ৩০ ঘন্টার দুভিক্ষ উপোস পালন করে।
তদানিন্তন ব্রিটিশ ভারতে ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা মহত্মা গান্ধী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ স্বরূপ অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। এটি ঐ সময় সমস্ত ব্রিটিশ রাজত্বে ও বিশেষভাবে উপমহাদেশের সাধারন মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।

◙ ইসলামঃ
ইসলমের পরিভাষায় সষ্ট্রা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর বিধান অনুযায়ী সুবেহ্ সাদিক বা সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় ও শারীরীক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা হচ্ছে সিয়াম। আল্লাহ ভীতি এবং সমাজের ধনী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে আত্মিক ও আধ্যাতিক সম্পর্ক ও ভালবাসা সৃষ্টির লক্ষ্যে সিয়াম করতে হয়। সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক সকল মুসলমানেরই সিয়াম করা অবশ্যই পালনীয়। সিয়ামের জন্য এর নিয়ত বা শপথ অবশ্যই করনীয়।
কুরআনে কারীমে অনেক স্থানে সওম করার কথা বলা হয়েছে। কয়েকটি উল্লেখ যোগ্য আযাত হল-

▀ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতগণের উপর। আশা করা যায় তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্য জাগ্রত হবে। [ বাকারা – ১৮৩ ]

▀ রমজান মাস, ইহাতেই কুরআন নাযিল হয়েছে, তা সমস্ত মানব জাতির জন্য জীবন-যাপন বিধান এবং তা এমন সুস্পস্ট উপদেশাবলিতে পরিপূর্ণ যা সঠিক ও সত্য পথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিস্কার করে। [ বাকারা – ১৮৫]

▀ আজ হতে যে ব্যক্তিই এমাসের সম্মুখীন হবে তার পক্ষে পূর্ণ মাসের সওম করা একান্ত কর্তব্য। আর যদি কেহ অসুস্থ হয় কিংবা ভ্রমন কার্যে ব্যস্ত থাকে তবে সে যেন অন্যান্য দিনে এ সওম পূর্ণ করে লয়। [ বাকারা ১৮৫ ]

▀ আর রাত্রিবেলা খানা-পিনা কর যতক্ষন পর্যন্ত না তোমাদের সম্মুখে রাত্রির বুক হতে প্রভাতের শেষ আভা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তখন এসব কাজ পরিত্যাগ করে রাত্রি পর্যন্ত তোমরা সওম পূর্ন করে লও। [ বাকারা – ১৮৭ ]

কয়েকটি উল্লেখ যোগ্য হাদীস –
▀ যে লোক রমজান মাসের সিয়াম রাখবে ঈমান ও চেতনা সহকারে, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। [ সহীহ বুখারী ]

▀ সওম ঢাল সরূপ। তোমাদের কেউ কোনদিন সওম করলে তার মুখ থেকে যেন খারাপ কথা বের না হয়। কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে বা বিবাদে প্ররোচিত করতে চায় তবে সে যেন বলে আমি সায়েম ( রোযাদার)। [ সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ]

▀ যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং তদানুযায়ী কাজ পরিত্যাগ করতে পারলো না, তবে এমন ব্যক্তির পানাহার পরিত্যাগ করা আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। [ সহীহ বুখারী ]

আরবী চন্দ্রমাসের রমজান মাসে সিয়াম করতে হয়। এছাড়াও যে সমস্ত সময় সিয়াম করা হয় তা হচ্ছে-

▀ প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতি বার
▀ প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখ
▀ রমজান মাসের পূর্বে রজব ও শাবান মাসের সম্ভাব্য সকল সময়
▀ সওয়াল মাসের ৬ দিন ( রামজান মাসের পরে )
▀ আরাফার দিন ( ৯ম জিরহজ্ব )
▀ আশুরার ২ দিন (১০ মুহররম আশুরা )
▀ ১ম দশ দিন জিলহজ্ব মাস।

চন্দ্র বছরে দুইটি সময় ব্যতিত সকল সময় সিয়াম করা যায়। চন্দ্র বছরের ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদ-উল-আযৃহা এর সময়কাল সিয়াম নিষিদ্ধ।

◙ সমাপিকাঃ

উপরে আপনাদের সিয়াম সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মের মত, মেডিকেল ক্ষেত্রে ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব এবং সর্বশেষ ইসলামে এবং গুরুত্ব অতি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরলাম। আমার বিশ্বাস সিয়াম সম্পর্কে আপনারা আমার থেকে অনেক বেশী জানেন ও বুঝেন । আমি শুধুমাত্র এটিই তুলেধরার চেষ্টা করেছি যে সিয়াম শুধু মাত্র ইসলামে নেই বরং বিশ্বের সমস্ত ধর্মেই এর শিক্ষা দেয়। আবার এর গুরুত্ব মেডিকেল সায়েন্স ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও রয়েছে। সুতরাং আসুন আমরা সকলে মিলে রহমত মাগফেরাত ও নাজাতের এই মাসে একসাথে সিয়ামের যথাযথ পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের তাঁর সকল হুকুম মানার তৌফিক দান করুন। আমীন॥

বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিয়াম বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিয়াম Reviewed by বায়ান্ন on June 20, 2015 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.